গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন অনেক আসামি। গতকাল বিকাল পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত ১৩৯ ও অজ্ঞাত ২০০ থেকে ৩০০ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯৫ জন। এর মধ্যে ৪০-৪৫ জন এজাহারভুক্ত আসামি। ঘটনার ১৫ দিন পরও ঘটনাস্থল দখিনখান এলাকার জীবনযাত্রার বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল সরেজমিন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বাড়িতে তালা ঝুলছে। এলাকায় পুরুষ লোক নেই বললেই চলে।
এলাকার ষাটোর্ধ সেতারা বেগম বলেন, প্রতিদিনই আসামির খোঁজে পুলিশ-র্যাব আসে। বুধবার রাতেও মন্ত্রীর ভাতিজা মনির মোল্লার গাড়ির চালক আমির হোসেন ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মোবারক হোসেনকে ধরে নিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতেও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার রাতে হামলায় অংশ নেওয়া একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এক মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, এক যুবক ছাত্রদের আটক করে অশ্লীল গালাগাল দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছেন। দেওয়ালে মাথা ঠুকিয়ে আঘাত করতেও দেখা গেছে। ওই যুবককে ‘মন্ত্রী মোজাম্মেল হক ও জাহিদ আহসান রাসেল দেশের এবং আমাদের গর্ব। তারা কারও ক্ষতি করে নাই’ বলতে শোনা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়দের অনেকে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় মন্ত্রীর আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের অনেকেই বেপারোয়া হয়ে উঠেছিলেন। অনেকের বিরুদ্ধে ছিল জমি দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ। তাদের মধ্যে মন্ত্রীর দুই ভাতিজা আমজাদ মোল্লা (৪০) ও মনির মোল্লা (৪৮) এবং তাদের সহযোগী হিমেল সরকার (২৮), আরিফ চৌধুরী (৩০), শাওন মোল্লা (২৮), ভাইয়া বাহিনীর তিন সদস্য আবু জাহিদ, আবু সাইদ ও হারুন অর রশিদ ছিলেন অসম্ভব ক্ষমতাধর। হামলার ঘটনায় তারা সবাই অংশ নিয়েছিলেন।
দাখিনখানের মৃত ওমর আলীর ছেলে ভাইয়া বাহিনীর তিন ভাইয়ের মধ্যে আবু জাহিদ চাকরি করেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স বিভাগে। বিশ্বস্ত লোক হওয়ায় তাকে আ ক ম মোজাম্মেল হকই এই চাকরিটা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর প্রভাবেই আবু জাহিদ কর্মস্থলে ও এলাকায় চাঁদাবাজি ও জমি দখলে জড়িত ছিলেন। ছাত্রদের ওপর হামলার পর ক্যাডার বাহিনীর আমজাদ মোল্লা গ্রেপ্তার হলেও অন্যরা পলাতক।
মামলার তদন্ত কর্মকতা গাজীপুর সদর থানার উপপরিদর্শক (এস আই) মো. উজ্জল হোসেন বলেন, ‘আসামি ধরতে পুলিশ কাজ করছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় ১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জনের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদের জ্ঞিাসাবাদ করা হবে।’
উল্লেখ্য, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে লুটপাট চালানো হচ্ছে বলে খবর দিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র-জনতাকে সাহায্য করতে ডেকে নেওয়া হয়। ছাত্ররা সেখানে যাওয়ার পর মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়েছে জানিয়ে লোকজন জড়ো করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১৭ জনের বেশি আহত হয়। এ ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মুহিম সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় ২৩৯ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়।