অজ্ঞাতনামাদের নামে মামলা দেওয়ার অপচর্চা বন্ধ করতে হবে, কোনো পুলিশ সদস্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কাউকে এ ধরনের মামলায় হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে-এ রকম আরও সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছেন পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া বা গায়েবি মামলায় অনিবাসী, মৃত, নিরপরাধ নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তল্লাশির সময় পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিতে অস্বীকার করলে অথবা সার্চ ওয়ারেন্ট না থাকলে জরুরি যোগাযোগের জন্য নাগরিক নিরাপত্তাবিধানে একটি জরুরি কল সার্ভিস চালু করতে হবে। অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম, ভিডিও রেকর্ডিং ডিভাইসসহ ভেস্ট বা পোশাক পরতে হবে। জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও আহত করার জন্য দোষী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। থানায় জিডি গ্রহণ বাধ্যতামূলক, কোনোক্রমেই জিডি গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। জিডি গ্রহণে কালক্ষেপণ বা ওজরাপত্তি করলে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মামলার এফআইআর গ্রহণে কোনোরূপ অনীহা বা বিলম্ব করা যাবে না। থানায় বাদী বা বিবাদীদের নিয়ে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা, আরবিট্রেশনের জন্য বৈঠক বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুলিশ আইন, ১৮৬১; পুলিশকে জনবান্ধব ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য এ আইনের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিমার্জন অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। পুলিশের কাজকর্মে ইচ্ছাকৃত ব্যত্যয় বা পেশাদারি দুর্নীতি রোধে স্বল্পমেয়াদি একটি কার্যক্রম হিসেবে ‘ওয়াচডগ’ বা ‘ওভারসাইট কমিটি’ গঠন করতে হবে। প্রতিটি থানা বা উপজেলায় একটি ‘সর্বদলীয় কমিটি’ গড়ে তুলতে হবে, যারা স্থানীয় পর্যায়ে ‘ওভারসাইট বডি’ হিসেবে কাজ করবে এবং দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা একান্ত প্রয়োজন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সততা ও নৈতিকতার উচ্চমান নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার পর তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
পদায়ন, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠাকে গুরুত্ব প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। থানার কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অপবাদ বা অভিযোগ পুলিশ সুপার কর্তৃক তদন্তের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি থানায় বিবিধ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন যেমন লাশ পরিবহন, সাক্ষী আনা-নেওয়া, বেওয়ারিশ মৃতদেহের সৎকার ইত্যাদি।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার জন্য এবং স্ব-স্ব ধর্মীয় নৈতিকতা শিক্ষা দিতে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এ-সংক্রান্ত পৃথক প্রশিক্ষণ মডিউল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। প্রত্যেক পুলিশ সদস্য ‘জনগণের সেবক এবং বন্ধু’ এ মনোভাব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে পুলিশিং কার্যক্রমের প্রতিনিয়ত ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত অ্যান্ডভান্সড ডিজিটাল ফরেনসিক এবং ডিএনএ অ্যানালাইসিস, বায়োমেট্রিকভিত্তিক, ডেটাভিত্তিক, এআইভিত্তিক (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) এবং সাইবার অপরাধ ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত ইত্যাদি সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশ পুলিশে প্রচলন করতে হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন পর্যায়ে যে হটলাইন নম্বরগুলো আছে সেগুলোর তৎপরতা ও কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। মহিলাকেন্দ্রিক সেবামূলক কর্মকা যেমন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারসহ উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন এবং পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ৬৪ জেলায় স্থাপন করতে হবে। পুলিশ ব্যারাকে অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকায় পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ হ্রাস করার জন্য তাদের বছরে একবার ভাতাসহ নির্দিষ্ট মেয়াদের ছুটি ভোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পুলিশ সার্ভিসের পুলিশ সুপার, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদায়নের জন্য ফিটলিস্ট প্রস্তুত করে নিয়মিত বিরতিতে হালনাগাদ করতে হবে। হালনাগাদকৃত তালিকা থেকে পুলিশ সুপার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদায়ন করতে হবে। এ ছাড়া পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে থানাভিত্তিক মামলা কার্যক্রমের অগ্রগতিসংক্রান্ত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুত্ত রাখতে হবে।