দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন মসনদে বসেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। জবাবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে চীন, কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতেই টালমাটাল হয়ে পড়েছে বিশ্ববাণিজ্য। নতুন এ শুল্কযুদ্ধে ধস নামছে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে। বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে স্বর্ণের দাম। প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারেও। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক মন্দা ও বেকারত্ব বাড়িয়ে দেবে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের শেয়ারবাজার বড় ধাক্কা খেয়েছে। পরদিন বৃহস্পতিবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নিচের দিকে নামতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারসূচক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর গত কয়েক দিনে মার্কিন শেয়ারবাজার থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেছে। এ ঘটনা বাণিজ্যযুদ্ধ উসকে দিয়েছে; যা বিনিয়োগকারীদের মধ্য আতঙ্ক ও আসন্ন মন্দার ভয় বাড়িয়ে তুলেছে। শেয়ারবাজারে এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক দিনের শেষে ৬ শতাংশ এবং গত দুই দিনে ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে; যার ফলে মাত্র দুই দিনে সূচকটির বাজার মূলধন ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে গেছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মিলিয়ে ডাউ সূচক ৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নাসডাক সূচক ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই টোকিওর শেয়ারসূচক প্রাথমিকভাবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়, যদিও দিন শেষে পতনের হার দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯ শতাংশে। হংকং ও সাংহাইয়ে একই প্রভাব পড়েছে। কোথাও পতনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ, কোথাও আবার ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুধু শেয়ারবাজারই নয়, ট্রাম্পের ঘোষণায় বিশ্ববাজারে সোনার দামেও প্রভাব পড়েছে। নতুন রেকর্ড গড়ে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ১৬০ ডলারে উঠে গেছে। প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারেও। অপরিশোধিত তেলের ব্র্যান্ড ব্রেন্ট ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৫৬ ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রভাব থেকে রেহাই পাননি বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেররা। এক দিনেই ২০ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সম্পদ খুইয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ধনী। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের ১৩ বছরের ইতিহাসে এটি এক দিনে চতুর্থ বৃহৎ পতন। ব্লুমবার্গের সম্পদসূচক অনুসারে, অর্ধেকের বেশি ব্যবসায়ীর ভাগ্যের পতন ঘটেছে এদিন। গড়ে তাঁদের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি সম্পদ হারিয়েছেন মার্কিন ধনকুবেররা। মেটাপ্রধান মার্ক জাকারবার্গ ও অ্যামাজনপ্রধান জেফ বেজোসের সম্পদ কমেছে সবচেয়ে বেশি।
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে মন্দার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বখ্যাত মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গ্যান। তারা বলছে, চলতি বছরেই আমেরিকান অর্থনীতি মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। মন্দা হলে তার সঙ্গে বেকারত্বও বাড়বে। কোম্পানির প্রধান অর্থনীতিবিদ মাইকেল ফেরোলি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) সংকুচিত হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে। সারা বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা ৬০ শতাংশ। এর আগে মন্দার আশঙ্কা ৪০ শতাংশ। চলতি বছরে আমেরিকার অর্থনীতি মন্দার মুখোমুখি হলে বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশে উঠে যেতে পারে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি জানিয়েছে, মন্দার আশঙ্কা নিয়ে আলাপ-আলোচনা আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে শেয়ারবাজার, বন্ড ও মুদ্রাবাজারের যে অবস্থা, তাতে মন্দার বাস্তবতা শুরু হয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ মন্দা আসার আশঙ্কা প্রায় ৪০ শতাংশ। এ আশঙ্কার কারণেই শেয়ারের বর্তমান দাম এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের কার্যকলাপ কিছুটা প্রভাবিত হচ্ছে।