চলতি বছরের ১৪ অক্টোবরের পর উইন্ডোজ-১০ অপারেটিং সিস্টেমের জন্য আর কোনো সফটওয়্যার হালনাগাদ, নিরাপত্তা সংশোধনী বা কারিগরি সহায়তা দেবে না মাইক্রোসফট। এদিকে, উইন্ডোজ ১১-এ আপগ্রেডের জন্য উন্নত হার্ডওয়্যারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে, পুরোনো মডেলের ২৪ কোটি কম্পিউটার ইলেকট্রনিক বর্জ্য হিসেবে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হতে পারে, যা পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার, নতুন কম্পিউটার কেনার পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয় নিয়ে এখন থেকেই পর্যালোচনা করছেন অনেক ব্যবহারকারী।
উইন্ডোজ-১০-এর সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার কারণে পরিবেশ ও ব্যবহারকারীর ওপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ডেটা ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হলো
পটভূমি এবং হার্ডওয়্যার প্রয়োজনীয়তা
২০২১ সালের শেষের দিকে উন্মোচিত হয় উইন্ডোজ ১১। তবে এটি ডিভাইসে চালাতে উইন্ডোজ ১০ এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চমানের সিস্টেমের প্রয়োজন। বিশেষ করে ট্রাস্টেড প্ল্যাটফর্ম মডিউল (টিপিএম) ২.০ চিপ, ১ গিগাহার্টজ ডুয়েল-কোর প্রসেসর (সাধারণত ৮ম প্রজন্মের ইন্টেল বা এএমডি রাইজেন ২০০০ সিরিজ), ৪ জিবি র্যাম এবং ৬৪ জিবি স্টোরেজ। অনেক পুরোনো পিসিতে এসব হার্ডওয়্যারের সুবিধা নেই। বিশেষ করে টিপিএম ২.০ চিপ এসব পিসিতে নেই। ২০১৬ সালের আগের সিস্টেমগুলোতে ব্যাপকভাবে এই চিপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে, লাখ লাখ ডিভাইসের হার্ডওয়্যার পরিবর্তন না করলে উইন্ডোজ ১১-এ আপগ্রেড করা যাবে না, যা প্রায়শই অবাস্তব বা ব্যয়বহুল। তবে এসব হার্ডওয়্যার বাদেও অনেক পুরোনো মডেলের পিসি এখনো কার্যকর।
সম্ভাব্য ই-বর্জ্যের ডেটা
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্যানালিস রিসার্চ অনুমান করেছিল যে, উইন্ডোজ-১০-এর সমর্থন শেষ হলে (ইওএল) এবং উইন্ডোজ-১১-এর সঙ্গে হার্ডওয়্যারের অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন পিসি অচল হয়ে যাবে। এই সংখ্যা তখন বিশ্বব্যাপী উইন্ডোজ ১০ ইনস্টল করা কম্পিউটারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান ছিল। যদি এই পিসিগুলো ফেলে দেওয়া হয়, তবে আনুমানিক ৪৮০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম (৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন) ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই–বর্জ্য) তৈরি হতে পারে, যা প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার গড় গাড়ির ওজনের সমান। এ ছাড়া এই ডিভাইসগুলো ভালো অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও উইন্ডোজ-১০-এর সমর্থন শেষ হওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা আপডেট পাবে না। ফলে এসব পিসির মূল্য এবং চাহিদা কমবে।
তবে অন্যান্য অনুমান সামান্য ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে পিআইআরজি (পাবলিক ইন্টারেস্ট রিসার্চ গ্রুপ) পরামর্শ দিয়েছিল যে, ব্যবহৃত ১ বিলিয়ন উইন্ডোজ ১০ ডিভাইসের মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডিভাইস উইন্ডোজ-১১–এর আপডেট পাবে না। তাই সম্ভাব্য ই-বর্জ্য সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্য উৎপাদন ইতিমধ্যে ৬২ মিলিয়ন টন ছিল, যার মধ্যে সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে এক–চতুর্থাংশেরও কম।
বিপুলসংখ্যক পিসি ভাগাড়ে যাবে যে কারণে
নিরাপত্তা আপডেট: ২০২৫ সালের অক্টোবরের পরে উইন্ডোজ ১০ আর বিনামূল্যে নিরাপত্তা প্যাচ পাবে না, যার ফলে অসমর্থিত পিসিগুলো সাইবার হামলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এদিকে মাইক্রোসফট একটি ফি-এর বিনিময়ে ২০২৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বর্ধিত সুরক্ষা আপডেট (ইএসইউ) সুবিধা দেবে (অতীতের প্রোগ্রামের মতো, যেমন উইন্ডোজ-৭-এর জন্য প্রতিবছর ২৫-১০০ ডলার)। এই বিকল্প সম্ভবত ব্যক্তিগত গ্রাহকদের চেয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বেশি আকর্ষণীয় হবে। এই ফি প্রদান বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে উইন্ডোজ-১১-সমর্থিত ডিভাইস কেনা বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে অনেক ব্যবহারকারীর কাছে।
পুনর্বিক্রয় মূল্যহ্রাস: এই ২৪০ মিলিয়ন পিসির অনেকগুলো কার্যকরী হলেও এগুলো সমর্থিত অপারেটিং সিস্টেম চালাতে পারবে না। তাই সেগুলো পুনর্বিবিক্রয় বা পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা কমে যায়। ব্যবসা এবং গ্রাহকেরা সাধারণত এমন ডিভাইসগুলোকে পছন্দ করে, যেগুলোতে সক্রিয় সমর্থন পাওয়া যায়। এভাবে পুরোনো পিসিগুলোর চাহিদা কমে যায় এবং সেগুলো সেকেন্ড-হ্যান্ড বাজারে কম জনপ্রিয় হয়ে পড়ে।
পুনর্ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ: পুনর্ব্যবহার একটি বিকল্প হলেও ই-বর্জ্য (ইলেকট্রনিক বর্জ্য) পুনর্ব্যবহারের হার খুবই কম। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে মাত্র ১৫-২০ শতাংশ ই-বর্জ্য সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ২০১৯ সালে স্ট্যাটিস্টা জানিয়েছে, বিশ্বের মোট ই-বর্জ্য উৎপাদন ছিল ৫৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। ২০২৫ সালের পর অনেক পুরোনো পিসি ফেলে দেওয়ার কারণে পুনর্ব্যবহার অবকাঠামোকে অভিভূত করতে পারে। বিশেষত যদি ব্যবহারকারীরা এগুলো সাধারণ আবর্জনার সঙ্গেই ফেলে দেয়, তবে ব্যাটারি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
পরিবেশগত প্রভাব
ভাগাড়ে পিসি ফেলে দিলে তা পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। কম্পিউটারে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এবং ব্রোমিনেটেডের মতো বিপজ্জনক পদার্থ থাকে। এগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে এগুলো মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যেতে পারে। এসব উপাদান পোড়ালেও বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে যেতে পারে। ক্যানালিসের মতে, যদি ভাগাড়ে ৪৮০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম ই-বর্জ্য ফেলা হয়, তবে এটি পরিবেশে সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলবে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির মতে, ই-বর্জ্য বিশ্বব্যাপী দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর পুনর্ব্যবহার ক্ষমতার চেয়ে পাঁচগুণ দ্রুত বর্ধনশীল।
২৪০ মিলিয়ন পিসির সবগুলো ভাগাড়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কিছু ব্যবহারকারী হয়তো
বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার শুরু করতে পারেন: লিনাক্স মিন্ট বা উবুন্টুর মতো লিনাক্স ডিস্ট্রিবিউশনগুলো পুরোনো হার্ডওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে। এগুলো উইন্ডোজের একটি সুরক্ষিত এবং বিনামূল্যে বিকল্প।
দায়িত্বের সঙ্গে পুনর্ব্যবহার: অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল টেলিভিশন এবং কম্পিউটার রিসাইক্লিং স্কিম বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় ই-বর্জ্য ড্রাইভের মতো প্রোগ্রামগুলো বৈদ্যুতিক যানবাহন বা নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তিতে ব্যবহারের জন্য কম্পিউটারের উপকরণ (যেমন হার্ড ড্রাইভ থেকে বিরল আর্থ ধাতু, ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম) ব্যবহার করতে পারে।
উইন্ডোজ ১০ ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারে: কিছু ব্যক্তি সুরক্ষা ঝুঁকি মেনে নিয়ে অসমর্থিত সিস্টেম ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারে। তবে ব্যবসাগুলোর জন্য এটি কম কার্যকর। এই বিকল্পগুলো ব্যবহারকারীর সচেতনতা, সম্পদের অ্যাকসেস এবং মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
মাইক্রোসফটের ভূমিকা এবং সমালোচনা
মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও উইন্ডোজ ১১ চালুর মাধ্যমে এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। এ জন্য মাইক্রোসফট ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, যদি মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ১০ এর সমর্থন বাড়াতো বা উইন্ডোজ ১১ এর আপডেটের জন্য উন্নত হার্ডওয়্যার প্রয়োজনীয়তা কমাত, তবে ই-বর্জ্য কমানো সম্ভব হতো। তবে, নতুন হার্ডওয়্যার বিক্রির জন্য এই কৌশল অবলম্বন করেছে মাইক্রোসফট। এতে পিসি নির্মাতারা সুবিধা পেলেও হলেও, পরিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে উইন্ডোজ ১০ এর সমর্থন শেষ হলে, প্রায় ২৪০ মিলিয়ন পিসি ব্যবহারযোগ্য হবে না, যা প্রায় ৪ দশমিক ৮ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্যের সমান। যদিও পুরোনো পিসি পুনর্ব্যবহার বা বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পুনর্ব্যবহারের কম সুবিধা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আপগ্রেড করার খরচের কারণে অনেক পিসি হয়তো ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হবে। এর ফলে এটি বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা ব্যবহারকারীদের আচরণ, পুনর্ব্যবহার সুবিধা এবং মাইক্রোসফটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এটি প্রযুক্তি এবং পরিবেশের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বিডি প্রতিদিন/আশিক