ভয়াবহ সিসাদূষণের কবলে দেশ। দেশের অন্তত ৬০ ভাগ শিশু সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। এতে কমে যাচ্ছে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা। জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশু। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনি, লিভারসহ শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সিসাদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। বাড়ছে প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদরোগের ঝুঁকি। কমছে কর্মক্ষমতা। বাড়াচ্ছে গর্ভপাত ও মৃত সন্তান জন্মদানের ঝুঁকি। এই স্বাস্থ্যগত সমস্যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার ৬৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা দেশের জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, পিওর আর্থসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় সিসাদূষণের এমন ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ল্যানসেটে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ওপর সিসাদূষণের মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। এতে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা সূচক বা আইকিউ পয়েন্ট প্রায় ২ কোটি কমে গেছে। বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হৃদরোগে মারা যাচ্ছে। এই স্বাস্থ্যগত ক্ষতি দেশের ৬ থেকে ৯ শতাংশ জিডিপি ঘাটতির সমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পিওর আর্থ এবং ইউনিসেফের গবেষণা প্রতিবেদন ‘টক্সিক ট্রুথ (২০২০)’-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত।
সম্প্রতি ইউনিসেফের সহযোগিতায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। খুলনা, টাঙ্গাইল, পটুয়াখালী ও সিলেট জেলায় ৯৮০ এবং ঢাকায় ৫০০ শিশুকে পরীক্ষা করে সবার রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া যায়। চার জেলায় ৪০ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮০ শতাংশ নমুনায় প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসা পাওয়া যায়; যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মাত্রার চেয়ে বেশি।
সিসার উৎস খুঁজতে পিওর আর্থ ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের ২৫টি দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাধারণ ভোক্তা পণ্য পরীক্ষা করে ২০২৩ সালে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষকরা বাংলাদেশের চারটি জেলার বাজার থেকে নিত্যব্যবহার্য গৃহস্থালি পণ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। ২৪ ভাগ নমুনায় মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়া যায়। নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতব রান্নার ও খাবারের বাসনপত্র, সিরামিকের বাসনপত্র, রং, ভাত/স্টার্চ এবং খেলনা। সংস্থাটি ২০২৩ সালে খুলনার ৪৭টি বাড়ি থেকে ধাতব এবং সিরামিকের রান্নার পাত্র, খেলনা, তাবিজ, গহনাসহ বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য পণ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষায় উচ্চ মাত্রার সিসার উপস্থিতি পায়। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সিসা, অ্যাসিড, ব্যাটারি কারখানা পরিষ্কার ও পরিশোধনের সময় আইসিডিডিআর,বি মোট ১৪৭টি পরিবারের পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। এতে হলুদের গুঁড়া এবং উঠানের মাটির নমুনায় উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া যায়। অন্য গবেষণায় মাছের দেহেও বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানাভাবে পরিবেশে বিষাক্ত সিসা ছড়িয়ে পড়ছে। পরে তা খাদ্যচত্রের মাধ্যমে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাস থেকে শরীরে প্রবেশ করছে। সিসাদূষণের অন্যতম একটি কারণ হলো ব্যাটারি। সিসাযুক্ত পুরনো ব্যাটারি ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা মাটি-পানিকে দূষিত করছে। আবার ব্যাটারি ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও নিরাপদ না হওয়ায় সিসাদূষণ হচ্ছে। গৃহস্থালি পণ্যে সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়িঘর ও খেলনায় সীসাযুক্ত রং ব্যবহার করা হচ্ছে। খেলনাগুলো শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সিসাযুক্ত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে সিসা খাদ্যে মিশছে। হলুদসহ কিছু মশলার রং বাড়াতে সিসা ক্রোমেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিসার আরেকটি বড় উৎস ইলেকট্রনিক বর্জ্য। অর্ধ ডজনের মতো আইন ও নীতিমালায় সিসাদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বলা থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন নেই।
এমন বাস্তবতায় বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘পার্টনারশিপ ফর এ লেড-ফ্রি ফিউচার’ (পিএলএফ)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশও ২০৪০ সালের মধ্যে সিসাদূষণ রোধের মাধ্যমে শিশুদের ওপর সিসার বিষক্রিয়া নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ইউএসএআইডির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) : রাউন্ড ৭ (২০২৪-২০২৫)-এ প্রথমবারের মতো রক্তে সিসা ও অন্যান্য বিষাক্ত ধাতুর মাত্রা সম্পর্কে উপাত্ত সংগ্রহের মডেল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে যেখানে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন-বিপণন ঠেকানো যাচ্ছে না, সেখানে সিসামুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবেশবাদীদের মধ্যে।