বহু প্রতীক্ষিত ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো অগ্রগতি নেই, স্থবির হয়ে পড়েছে কার্যক্রমও। দেশের যুব ও তরুণ জনগোষ্ঠীতে প্রযুক্তিভিত্তিক ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সেবা প্রদানের উদ্বোধন বিলম্ব হওয়ায় হতাশ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর জন্য নির্ধারিত সময়সীমা দুই মাস আগে শেষ হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের একমাত্র লাইসেন্সধারী নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানে আপত্তি তুলে প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা, ব্যাংকার এবং প্রযুক্তিবিদরা এখানে নতুন ধরনের ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সেবার কার্যক্রম শুরুর আগেই একটি অশুভ পরিণতির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। আগ্রহী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে লাইসেন্সের জন্য আবেদন চাওয়ার আগে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের জন্য একটি নীতিমালা জারি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আহ্বানে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাইসেন্স প্রদানের আবেদন জমা নেয়। অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার পর, বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স পাওয়ার জন্য যোগ্য হওয়ার নির্দিষ্ট শর্তাবলির ভিত্তিতে এলওআই প্রদান করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৩ জুন নগদ ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যার শর্ত ছিল ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
কিন্তু জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর কর্মকর্তা জানান, নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য দেশি-বিদেশি তহবিলের উৎস এবং দাতাদের তথ্য যাচাই করতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আমরা বিদেশি তহবিলের উৎস সম্পর্কে তথ্য পেতে বাংলাদেশের বিদেশি মিশনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। কিন্তু আমরা এখনো বিস্তারিত তথ্য পাইনি। যথার্থভাবে ভার্চুয়াল ব্যাংকিং কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা কোনো সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।
যদিও লাইসেন্সের অধীনে এ ধরনের ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধনের সময়সীমা ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি। ডিজিটাল ব্যাংকিং নীতিমালার অধীনে, প্রত্যেক উদ্যোক্তার ন্যূনতম শেয়ার অংশীদারিত্ব হবে ৫০ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ শেয়ারহোল্ডার হতে হলে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার জন্য শুধু প্রধান কার্যালয় থাকবে। সেবা প্রদানে এই ব্যাংকের আর কোনো স্থাপনা, ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি), শাখা বা উপশাখা, এটিএম, সিডিএম অথবা সিআরএম থাকবে না। সব সেবাই দেওয়া হবে অ্যাপনির্ভর, মুঠোফোন বা ডিজিটাল যন্ত্রে। সেবা মিলবে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। ডিজিটাল ব্যাংক ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য চালু করতে পারবে। কোনো প্লাস্টিক কার্ড দিতে পারবে না। এ ব্যাংকের গ্রাহকরা অবশ্য অন্য ব্যাংকের এটিএম, এজেন্টসহ নানা সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। এটি ঋণপত্রও (এলসি) খুলতে পারবে না। শুধু ছোট ঋণ দেবে, বড় ও মাঝারি শিল্পে ঋণ দেওয়া যাবে না। তবে আমানত নিতে কোনো বাধা নেই।
ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে ১২৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে নীতিমালায়। বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকতে হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের একটি প্রধান কার্যালয় থাকবে। ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স পাওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। মৌলিক নিয়মগুলোতে বলা হয়েছে, ব্যবসা শুরু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে পূর্ব অনুমতি ছাড়া শেয়ার হস্তান্তর করা যাবে না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং ব্যবসার শুরু হওয়ার তিন বছরের মধ্যে দাতাদের শেয়ার হস্তান্তরের অনুমতি দেবে না। প্রযুক্তিবিদরা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের সেবা একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন একটি বিষয়, যেখানে প্রযুক্তির তুলনায় জনসংখ্যার সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংককে তার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি বাইরে থেকে যাতে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করে স্বচ্ছভাবে লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াটি পুনরায় শুরু করা উচিত।