সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে : ‘ডেমরা-রূপগঞ্জ চনপাড়া নিষিদ্ধ সেতুতে ঝুঁকি নিলে যাত্রা নিরাপদ’ বাস্তবতা জানলে নিশ্চিত হেসে ফেলবেন- সেতুতে গাড়ি উঠলেই হেলেদুলে ওঠে, যেন আপনিই ভারসাম্য হারাবেন। যেখানে প্রতিটি পিলার প্রায় আলগা, রেলিং ভাঙা, রড বেরিয়ে গেছে। অথচ প্রশাসন নির্বিকার, চোখ বন্ধ করে বসে আছে। প্রতিদিন মানুষ পারাপার হচ্ছে ঝুঁকির মধ্যে সৃষ্টিকর্তার নাম জপে। এটি প্রশাসনের উদাসীনতা, দুর্নীতি ও অবহেলার এক জীবন্ত প্রতীক। যেখানে সংবাদপত্রের ‘দ্রুত সংস্কারের দাবি’ কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ। বাস্তবে মানুষ ঝুঁকির মধ্যে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে।
যদি একদিন এই সেতুটি হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তবে কী হতে পারে তা অনুমান করা খুবই সহজ। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাবে, গাড়ি ভর্তি যাত্রী ও পণ্য একসঙ্গে ধ্বংস হবে, কয়েক সেকেন্ডেই পরিণত হবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। এরপর শুরু হবে আমাদের পরিচিত দৃশ্য- একটি শক্তপোক্ত তদন্ত কমিটি গঠন হবে, সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হবে, কয়েক দিন আলোচনা চলবে, তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি ভুলে যাবে মানুষ। কিন্তু যারা তাদের প্রিয়জন হারাবে, তাদের কাছে এই দুর্ঘটনা শুধু একটি খবর নয়, বরং জীবনের স্থায়ী ক্ষত। সেদিন শুধু কংক্রিট বা লোহার বিম ভাঙবে না, ভেঙে যাবে শতাধিক পরিবারের স্বপ্ন, ছোট ছোট শিশুর ভবিষ্যৎ, মানুষের আস্থা। প্রশাসনের উদাসীনতা ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে তাদের প্রাণ দিয়ে। মৃত্যুর আগে কোনো সতর্কতা নেই, কিন্তু মৃত্যুর পরে তদন্ত হয়, ফাইল তৈরি হয়, দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। আমাদের ‘উন্নয়ন’-এর মিথ্যাচার আসলে এখানেই- কাগজকলমে রিপোর্টে অগ্রগতি আছে, বাস্তবে মানুষ কেবল অনিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে বসবাস করছে।
চনপাড়া সেতু রূপগঞ্জ ও ডেমরার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মূল প্রাণরেখা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এটি ব্যবহার করে। শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে, শ্রমিক কাজে যাচ্ছেন, ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। বিকল্প পথ দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। সেতু ছাড়া প্রতিদিনের যাতায়াত অনেকবার বিপর্যয়ে পড়তে পারে। সেতুটি বন্ধ হলে শুধু যাতায়াত নয়, স্থানীয় শিল্প, কৃষি, পণ্য পরিবহন সবই স্তব্ধ হয়ে যাবে। যানবাহন চলাচল সবই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে আস্তে চলতে গিয়ে সেতুর ওপরে যানজট লেগেই থাকে। সেতু ভাঙলে শুধু কয়েক মিনিটের দুর্ঘটনায় অসংখ্য জান যে ক্ষতি হবে তা নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা থমকে যাবে। এখানেই বোঝা যায়, এই সেতু কেবল যোগাযোগ নয়, এটি জীবনের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক রক্তপ্রবাহ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সেতু বন্ধ থাকলেও মাসিক উৎপাদন ক্ষতি কোটি কোটি টাকা। স্থানীয় মানুষ জানে, ভাঙা সেতুতে পারাপার করা মানে অর্থ ও জীবন- দুটিরই ঝুঁকি। তবু এই সেতুতে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলছে।
সেতুর পিলারের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা যেন মৃত্যু অপেক্ষা করছে শতবর্ষী বৃদ্ধের দাঁতের মতো। বালু নদের ওপর দাঁড়ানো চনপাড়া সেতুর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পিলারের দুটি নৌযানের ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আরও দুটি বহু বছর ধরে আলগা অবস্থায় রয়েছে, পিলারের নিচের মাটি সরে গেছে। বর্ষার মৌসুমে নদের স্রোত আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা বলছে, ‘প্রতিদিন পারাপারের সময় মনে হয়, কোনো মুহূর্তেই সেতু ভেঙে যেতে পারে।’ এটি কেবল অবকাঠামোর সমস্যা নয়। এটি মানুষের জীবনের প্রতি প্রশাসনের উদাসীনতার নিখুঁত উদাহরণ।
প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সেতুটি নব্বই দশকে নির্মিত। নির্মাণকালে নিম্নমানের রড ও কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছিল। পর্যাপ্ত তদারকি ছিল না। মাত্র ২৫-৩০ বছরে সেতু ভাঙনের মুখে। নির্মাণকাল থেকেই দুর্নীতি। আজ সাধারণ মানুষ সেই দুর্নীতির মাশুল দিচ্ছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। নির্মাণত্রুটি ও দুর্নীতি একসঙ্গে মিলে একটি ‘মৃত্যুর ফাঁদ’ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেতুর প্রকৌশলগত ত্রুটি প্রতিদিন ৫০-৬০ ভাগ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রশাসন রিপোর্ট জমা দিয়ে সময় নষ্ট করছে। শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সবাই জানে ঝুঁকির কথা। একটি ভুল মুহূর্তে বিপর্যয়। মানুষ জেনে পারাপার করছে, মানসিক চাপ নিয়ে। আতঙ্ক দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি দৈনন্দিন জীবনের এক ধরনের জুয়া। স্থানীয়রা বলেন, ‘একদিন দুর্ঘটনা ঘটবেই, সেটিই আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা।’ তবু প্রশাসন নিঃশব্দ কেন এই প্রশ্ন সবার।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা, ভিডিও ফুটেজ ও রিপোর্ট সবই প্রমাণ দেয় যে ঝুঁকি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন এখনো বসে আছে। এই উদাসীনতা শুধু অবকাঠামোর নয়, মানুষের জীবনের ওপর চরম প্রভাব ফেলছে। উদাসীনতা মানুষের জীবনকে অমূল্য বলে বিবেচনা করে না। প্রতিদিন মানুষ ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করছে, প্রশাসন অচল। নৌযান চলাচল, নদীর প্রবাহ, ট্রলার, গাড়ি সব মিলিয়ে পিলার ক্ষতিগ্রস্ত। প্রশাসন সমন্বয় করতে ব্যর্থ। ফলে সেতু যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। প্রতিদিন নৌযান ও ট্রাকের সংঘাতের কারণে সেতুর অচল অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষক মোতালেব মিয়া বলেন, ‘প্রশাসন শুধু একদিন বড় দুর্ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা লাশ হব কবে সেই অপেক্ষা’ মানুষ জানে, এক ভুলে সেতু ভেঙে যেতে পারে। পরিবার, সন্তান, জীবিকার ভরসা সব ঝুঁকিতে। স্থানীয়রা বলছে, ‘প্রতিদিন মনে হয় আমরা মৃত্যুর সঙ্গে খেলছি।’
যে কোনো শিল্পাঞ্চলের জন্য একটি সেতু কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি আসলে অর্থনীতির মূল শিরা। প্রতিদিন হাজার হাজার ছোটবড় পরিবহন এই সেতুর ওপর নির্ভর করে পণ্য সরবরাহ করে থাকে। যদি এই সেতু ভেঙে যায় বা অচল হয়ে পড়ে, তবে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থায় ভয়াবহ ব্যাঘাত ঘটবে। সময়মতো কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাবে না, আবার প্রস্তুত পণ্য বাজারে যেতে না পারলে মজুত জমে উঠবে। এর ফলে একদিকে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে পরিবহন খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাবে, কারণ বিকল্প দীর্ঘ পথে গাড়ি চালাতে হবে। প্রতিদিনের এ ক্ষতি জমতে জমতে কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়াবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে ধাক্কা দেবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিশ্রুতির ভণ্ডামি নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে জনগণকে স্বপ্ন দেখানো হয়- ‘সেতু হবে, রাস্তা হবে, উন্নয়ন হবে।’ কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতি যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। সেতু সংস্কার বা নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোট চাওয়ার সময় প্রার্থীরা এই সেতুর ছবি নিয়ে প্রচারণা চালান, জনসভায় দাঁড়িয়ে আশ্বাস দেন ‘কিছুদিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বছর ঘুরে যায়, অথচ কাজ শুরু হয় না। জনগণের চোখে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে রাজনীতি শুধু প্রচারণার ছবি আর পোস্টারে আটকে থাকে, মানুষের জীবন আর প্রয়োজনীয়তা পড়ে থাকে দ্বিতীয় সারিতে। এই উদাসীনতা শুধু হতাশাই বাড়াচ্ছে না, নাগরিকদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভও জমাচ্ছে। মানুষ ভাবছে, প্রতিবার ভোটের আগে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ভোট হয়ে গেলে আর মনে রাখা হয় না। প্রশাসনের দায়িত্বশীল মহলও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ওই সেতু পার হচ্ছে, অথচ কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। সরকারের অমনোযোগী ভূমিকা আসলে প্রতিটি নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে এক অদৃশ্য শাস্তি ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা, অতিরিক্ত খরচ বহন করা এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে জীবনযাপন করা। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির এই ভণ্ডামি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, আর তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
উন্নত দেশগুলোতে যখনই কোনো সেতুতে ফাটল বা ত্রুটি দেখা দেয়, তখন প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিশেষজ্ঞ দল এসে পরিস্থিতি পরীক্ষা করে, প্রয়োজনে সেতু পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, যাতে একটি প্রাণও ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে। সেতুর নিচ দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে বিকল্প রুট খুলে দেওয়া হয়, আর কয়েক দিনের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হয়। কারণ তাদের কাছে মানুষের জীবন অমূল্য, আর যে কোনো অবকাঠামো কেবল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রথমে ‘ফাটল ধরা পড়েছে’ বলে একটি রিপোর্ট জমা হয়, তারপর হয় একের পর এক মিটিং, অথচ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রতা আসলে জীবনকে তুচ্ছ করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
পরিশেষে বলতে হয়, চনপাড়া সেতুটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং আমাদের দেশের প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে মানুষের জীবন নয়, বরং কাগজ ও ফাইলের অগ্রাধিকার বেশি। সেতুটি প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ঝুঁঁকি নিতে বাধ্য করছে, অথচ কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। মৃত্যুর আগে কোনো সতর্কতা নেই, মৃত্যুর পরে হয় তদন্ত এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা প্রায়ই উন্নয়নের গল্প শুনি- বড় বড় বাজেট, বিশাল প্রকল্প, বিদেশি ঋণের চমক। কিন্তু বাস্তবে এসব উন্নয়ন মানুষের জীবনকে নিরাপদ করছে না। চনপাড়া সেতু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে ‘উন্নয়ন’ শুধু কাগজকলমে সীমাবদ্ধ, মাঠপর্যায়ে মানুষ রয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে। এটি কেবল একটি সেতুর সংকট নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতার নগ্ন প্রমাণ।
লেখক : কলামিস্ট
www.mirabdulalim.com