২৯ নভেম্বর ২০২৪ বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমি ‘কোথা থেকে কখন যে কী হয়ে গেল’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তখন হঠাৎ করে ট্রাকে ট্রাকে মানুষ শাহবাগের দিকে ধেয়ে আসছিল বিনা সুদে ঋণ পাওয়ার মিথ্যা ঘোষণা শুনে।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাঠ প্রশাসন, আর বিপ্লব ঘটানো ছাত্র-জনতার কাতারে থাকা লড়াকু মানুষগুলো সজাগ থাকলে মাইক্রো ভাড়া করা, লোকজন জড়ো করে গাড়িতে ওঠা, যে বাস-ট্রাক রাজধানীতে দিনের বেলা ঢোকার কথা নয়, সেসব বাস বা ট্রাক সবার চোখের সামনে দিয়ে ঢুকে শাহবাগ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অবশ্যই ঠেকানো যেত। এমন সব সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা দায়িত্ব যাদের, তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করলেও ঠিকই কিন্তু যার যার অবস্থানে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। তাদের অবস্থা বর্ণনা করে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থে ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘সরকারি বাসে চড়ছি, দরকারি কাগজ পড়ছি, কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, চকচকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি, দুবেলা পার্কে যাচ্ছি, মাইক্রোফোনে কথা শুনছি, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি।’ এভাবেই ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০১, ২০২৪-এ স্বার্থপর ও ধান্দাবাজেরা আগের জমানায় সমাজ আর বঞ্চিত হওয়ার চিত্র এঁকে এঁকে ঝাঁকে মিশে যেতে সময় নেয়নি।
আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম- ‘খুব অস্বাস্থ্যকর বাতাস নিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় দূষিত শহর ঢাকা।’ অথচ সেই ১৯৭০ সালে কবি শামসুর রাহমানের ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল, যার একটি অংশে এ ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’ কবিতাটির স্থান পেয়েছিল। মজার বিষয় হলো, শহুরে এ কবি এ কবিতায় তখনই লিখেছিলেন- ‘নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, মাটি কাটছে ট্রাক্টর, ফ্যাক্টরি ছাড়ছে ধোঁয়া, কাজ হচ্ছে- কাজ হচ্ছে, কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাচ্ছি, কাজ করছি...’। আসলে সবাই কাজ করছে, কাজ হচ্ছে, সেই সঙ্গে কাজের নামে ‘অকাম’-‘কুকাম’ এসব থেমে নেই বলে বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহরে আমরা প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করছি, বুক ভরে বিষ নিচ্ছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি আর ঘুমাচ্ছি।
এসব দেখে শহুরে কবিরা যখন কবিতা লেখেন আর গ্রামের তাজা বাতাস খাওয়া সহজসরল বাউলরা নেচে নেচে গান গেয়ে বেড়ান- ‘তোরা বাতাস কর, বাতাস কর, বাতাস কর সখী, মাথায় পানি ঢাল তোরা, যা করার তা কইরা গেছে, আমার বন্ধু মনচোরা।’ পরিস্থিতি কি তাহলে সত্যি এ রকম? আমরা সাধারণ জনগণ কি কেবল বাতাস করে যাব আর পানি ঢালব কর্তাব্যক্তিদের মাথায়? আর ধান্দাবাজরা যা করার তা করে যাবে? সেই ২৯ নভেম্বর আমি আসন্ন এক মাসে তথা বছরের শেষ ও নতুন বছরের শুরুতে কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন তা ইঙ্গিত করতে গিয়ে পাঠ্যবই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে না পৌঁছানোর শঙ্কাও প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এত দিন যারা পাঠ্যবই ছাপানোর নামে নয়ছয় করেছেন, তারা এখন পাঠ্যবই প্রকাশে বিলম্ব দেখে হাসছেন। অন্যদিকে বইয়ের শেষে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা কিংবা রংপুরের বীর শহীদ আবু সাঈদের ভুল মৃত্যু তারিখ দেখে অট্টহাসিতে লুটোপুটি খাচ্ছে আগের আমলে বইয়ে গুগলের অনুবাদ নিজের লেখা বানিয়ে চালিয়ে দেওয়া এবং সম্মানী গ্রহণ করা সুশীল সমাজ। আসলে চোরেরা ধর্মের কাহিনি শোনে না, যা করার তা করে যায় আর আমলারা কী পেলাম আর কী পেলাম না কিংবা পেয়েও হারালাম কী কী- এসব হিসাব করতে করতে একদিন পেনশনে চলে যান। আবার সুযোগ পেলে পেনশন ফিরে বৈষম্যের ধুয়া তুলে আবারও ‘খাচ্ছি যাচ্ছি কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছি’ আওয়াজ তোলেন। আর এতেই দেশ ও জনগণের যাচ্ছি যাচ্ছি অবস্থা।
গত সপ্তাহজুড়ে আলোচিত ছিল নির্বাচন প্রসঙ্গ। নির্বাচন শব্দটি দীর্ঘদিন এ দেশে নির্বাসিত ছিল, না নির্বাচন নামে সার্থক কোনো কিছুর অস্তিত্ব স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কোনো দিন এ দেশে ছিলই না বা ছিল, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। সেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় নির্বাচনে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স তুলে এনে ঢাকায় গণনা ও ফল ঘোষণার কাহিনি আজও মনে পড়ে দাউদকান্দিবাসীর। ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে তথা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামক একটি মাত্র দল এবং একজন নেতা ছাড়া বাকি সবকিছু নিষিদ্ধের আয়োজন করা হয়েছিল। বাকশাল কায়েম হলে আসলে প্রকৃত অর্থে নির্বাচন করার কোনো প্রয়োজনই হয়তো এ দেশে হতো না। এর বিপরীতে দেশ পেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন ও ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নামক নতুন রেফারেন্ডামে (গণভোট) তখন কোনো কোনো কেন্দ্রে শতভাগেরও বেশি ভোট প্রদানের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল।
জিয়ার পর এরশাদ এলেন, দেখলেন, নির্বাচন নিয়ে খেললেন। মুখে ‘খেলা হবে’ না বললেও কাজকর্মে ঠিকই বুঝিয়ে দিলেন নির্বাচন তার কাছে হিন্দি সিনেমায় অমিতাভের বিখ্যাত সংলাপ- ‘ইয়ে তো মেরা বাচপান কা খেল হ্যায় জেলার সাব’-এর মতো নির্বাচনও তার কাছে ছোটবেলার খেলার চেয়ে বেশি কিছু নয়। যাকেতাকে ধরে জনপ্রতিনিধি বানিয়ে দেওয়া নির্বাচন আয়োজন তার প্রতিদিনের গলফ খেলার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এরশাদ বিদায় নিলেন।
প্রথম একটি প্রকৃত নির্বাচনের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৮ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। কিন্তু বিরোধী আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি তা মানতে পারল না। পাঁচ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১৪৬ আসন পেয়ে সরকার গড়ল আওয়ামী লীগ, মানল না বিএনপি। ২০০১-এর নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসন পেয়ে সরকার গঠন করলেও আওয়ামী লীগ দাবি করল ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি না করায় তাদের হারিয়ে দিয়েছে আমেরিকা। বিএনপির ২০০৬ সাল মেয়াদ শেষের আগে নির্বাচন নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হলো। ফলে দেশে আবির্ভূত হলো সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দুই বছর কোনো প্রকার জাতীয় নির্বাচনবিহীন ছিল বাংলাদেশ।
এরপর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার আয়োজিত ২০০৮-এর ভোটে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০১৪ সালে ভোটবিহীন ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নিযুক্তির নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের নির্বাচন ও ২০২৪-এ ভোটারবিহীন নির্বাচন উপহার দিল। আরও উপহার দিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর নাক গলানোর নতুন অধ্যায়। এভাবেই প্রকৃতপক্ষে নির্বাসিত ছিল নির্বাচন শব্দটি।
জুলাই বিপ্লবে সামনে ছিল ছাত্রসমাজ। যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতই হতে পারত না। তাই ২০২৫ সালে সবার আগে তাদের নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেওয়া জাতির নৈতিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সব বাধা উপড়ে ফেলে প্রকৃতপক্ষে দেশের ছাত্রসমাজ কী চায়, তা প্রমাণ ও প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। এটা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানে কোন দল, মত বা সংগঠন কোন অবস্থানে আছে, তারও একটা পূর্বাভাস দেবে, যা পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনে করণীয় পন্থা উদ্ভাবনে সহায়তা করবে সব অংশীজনকে। নির্দিষ্টসংখ্যক ভোট না পেলে কাউকে নির্বাচিত না করার মতো কিংবা কাউকে ‘না’ ভোট দেওয়ার মতো যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে, সব করা যেতে পারে ছাত্র সংসদের এ নির্বাচনগুলোতে। ফলে তা একটি সুন্দর নিরীক্ষাও হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো জনপ্রতিনিধি না থাকায় এক অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক জনগণ। সামান্য একটি জন্মনিবন্ধন বা উত্তরাধিকার সনদপ্রাপ্তি এখন প্রান্তিক জনগণের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পালিয়ে যাওয়ার কারণে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও তাই অবিলম্বে আয়োজন করা উচিত এবং এ নির্বাচনেও ‘না’ ভোট বা নির্দিষ্টসংখ্যক ভোট না পেলে কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা না করার সুযোগ রেখে নিরীক্ষা করা যেতে পারে।
এসব নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে অবশ্যই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে এবং তত দিনে সব দল ও সংগঠন তাদের যার যার অবস্থান বুঝতে পারবে এবং সেই মোতাবেক সংশোধিত হয়ে কিংবা নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করে একটি সার্থক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। ২০২৫ হোক সফল নির্বাচনের সুবর্ণ বছর।
লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]