শরীয়তপুরের জয়নগর গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁর শাখানদী। ফলে এ গ্রামের কৃষক প্রকৃতির বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট। নদী তার চারপাশের জমিকে যেমন উর্বর রেখেছে, সম্ভাবনা জাগিয়েছে নানান ফসলের চাষাবাদেও। বিনা চাষে রসুন-পেঁয়াজসহ নানান মসলা ফসলের সঙ্গে আছে শীতের শাকসবজিও। আছে উচ্চমূল্যের ফল-ফসল। জহিরুল ইসলাম নামের এক উদ্যোক্তা এই গ্রামেই গড়েছেন ড্রাগন ফলের বাগান। মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এ বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কৃষিকে নিজের সাফল্যের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গত শতাব্দীর নব্বই দশকে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান ভাগ্যের অন্বেষণে। বছর দুয়েক থেকেই বুঝলেন দেশের মাটির মায়া ছেড়ে দূরদেশে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। ফিরে এলেন দেশে। যুক্ত হয়েছেন নানান রকম ব্যবসাবাণিজ্য আর পেশার সঙ্গে। শেষে কৃষির দিকেই ঝুঁকলেন। দুই বছর ধরে উদ্যোগ নিয়েছেন ড্রাগন ফল চাষের।
পাঠক প্রসঙ্গত বলে রাখি, ২০০৫ সালে ভিয়েতনামের কৃষি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথম ড্রাগন ফলের চিত্র তুলে ধরেছিলাম। তখন দেশের মানুষের কাছে ড্রাগন ফল তেমন পরিচিত ছিল না। এরও ১২-১৩ বছর পর বিদেশি ফল ‘ড্রাগন’ দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হতে থাকে। কয়েক বছর আগেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে অচেনা ফল ছিল ড্রাগন। এখন এ ফলটি চিনতে কারও বাকি নেই। বলা যেতে পারে, আমাদের দেশের ফলের তালিকায় এটি স্থান করে নিয়েছে। গত এক দশকে উদ্যোক্তাদের তৎপরতার পাশাপাশি নানা পর্যায়ের গবেষণা, সম্প্রসারণ ও সম্প্রচারের ফলে মানুষের কাছে ফলটি দিনে দিনে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা জায়গায় ড্রাগন ফল উৎপাদনের সফলতার গল্প তুলে ধরেছি। অথচ খুব বেশি দিনের কথা নয়, ২০১০ সালে সাভারের আশুলিয়ার মচিরকাটা গ্রামে রুম্পা চক্রবর্তী শুরু করেছিলেন ড্রাগন ফলের চাষ। সেটিই ছিল দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক বাগানের কোনো সাফল্যের খবর। এরপর বাড়ির আনাচকানাচ থেকে শুরু করে বড় বড় খামারে সবখানে শুরু হয়েছে ড্রাগন ফলের উৎপাদন। কৃষক থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, গৃহিণী কিংবা শিক্ষার্থী ড্রাগন চাষের বাণিজ্যিক ব্যাপারটিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন অনেকেই।
এখন বাড়ির আনাচকানাচ থেকে শুরু করে বড় বড় খামারে সবখানে শুরু হয়েছে ড্রাগন ফলের উৎপাদন। বেড়েছে এর জনপ্রিয়তাও। ফলে ড্রাগন হয়ে উঠেছে লাভজনক এক ফল। জহিরুল ইসলামও বলছিলেন দুই বছরে যত বিনিয়োগ করেছেন তার অর্ধেক ইতোমধ্যে উঠে গেছে। সাধারণত শীতে দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হওয়ায় ড্রাগন ফল ফলে না। তাই অমৌসুমে ফল পেতে জহিরুল ড্রাগন বাগানে যুক্ত করেছেন এলইডি লাইট।
বছর সাতেক আগের কথা। চীনের গোয়াংডং প্রদেশের জংশান শহর থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে শিনশিং কাউন্টির একটি গ্রামে ঢুকেছি। সঙ্গে ছিলেন জংশানের কৃষিপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের এক উদ্যোক্তা লিউ হে এবং আমার সহকর্মী আদিত্য শাহীন ও তানভীর আশিক। চীনে শীতকাল, শীতের দিনের মতোই মিষ্টি রোদ, তবে শীত শীত অনুভূতি নেই। লিউ হেকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমাদের এ কেমন শীতকাল? শীতের কোনো ছিটেফোঁটাও তো নেই! বিনয়ী লিউ হেসে জানাল, জলবায়ু পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। শীতকালে খুব একটা শীত আর পায় না তারা। বড়জোর তিন-চার দিন শীত পড়ে। উজ্জ্বল রোদের দিন। গ্রামটিতে যখন প্রবেশ করলাম সূর্য তখন পশ্চিম দিকে হেলেছে। ঝকঝকে নীল আকাশ। আর রোদের সোনালি আভায় মনে হলো, আমরা সত্যিকারের একটা চীনা গ্রামেই যেন প্রবেশ করলাম। এ কথা বলছি কারণ, চীনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এত বেশি ঘটেছে যে গ্রাম আর শহরকে এখন আর পৃথক করা যায় না। তবে সেখানটায় এখনো গ্রামের কিছুটা আবহ পাওয়া যাচ্ছিল। রাস্তার দুই পাশে ফসলের খেত। সোনালি রং নিয়ে ধান পেকে আছে। আছে সবজি বাগান। পালংশাকের চাষ করছেন কেউ। কেউ বা শর্ষে শাক কিংবা গাজর। খেতে যেসব কৃষককে চোখে পড়ছে তারা একেবারেই বৃদ্ধ। পুরুষ আর নারী বলে ভেদাভেদ নেই। একই কাজ নারী-পুরুষ মিলেমিশেই করছে। বয়স কারও ষাট থেকে সত্তরের কম নয়। কারণ চীনের তরুণরা এখন আর ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে না। তারা শৈল্পিক বা বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাদের একেকটি কৃষিক্ষেত্র মানে কৃষি কারখানা। শুধু গুটিকয় বয়স্ক কৃষক তাদের কৃষির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলারও চেষ্টা করেছি। দেখেছি ঐতিহ্যগত কৃষি তাদের জীবনীশক্তি। সেই চিরচেনা চীনা কৃষকের রূপ তারা এখনো ধরে রেখেছেন। মাথায় মাথাল আর কাঁধে কাঠের ভারে সেচের পানি নিয়ে খেতের আল ধরে হেঁটে আসছেন একজন। বিকালের পড়ন্ত রোদে অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারণা দেখেই মনে পড়ল সেই শৈশবে দেখে আসা সিনেমায় টেলিভিশনের চীনা কৃষক, এ দৃশ্য এখন খোদ চীন দেশেও পাওয়া কঠিন। ফল-ফসল ফলানোর তীব্র নেশায় কৃষক তাদের বয়স ভুলে গিয়ে মাঠে কাজ করছেন। এখনো ঠুমরি দিয়ে নালা থেকে সেচ দিচ্ছেন। পাহাড়ের পাশে চীনা ঐতিহ্যে কৃষিখামার দেখে অভিভূত হলাম। পথ চলতে চলতেই চোখে পড়ল বিশাল ড্রাগন ফলের বাগান। শীতকালে সাধারণত ড্রাগন ফলের মৌসুম নয়। তাই ক্যাকটাসজাতীয় এই গাছটির বাগান সবুজে ছেয়ে আছে। দিগন্তবিস্তৃত ড্রাগন ফলের বাগান। দূরে চোখে পড়ল ড্রাগনবাগানে সাদা সাদা কী যেন ঝুলছে! এক-দুইটা নয়, অসংখ্য। তানভীর আর আদিত্যের কাছে জানতে চাইলাম। দূরের ওই সাদা জিনিসগুলো কি বুঝতে পারছ কিছু? তাদের চোখেও বিস্ময় ও কৌতূহল। জানতে চাইলাম লিউয়ের কাছে। লিউ বল তো সাদা সাদা ওগুলো কী ঝুলছে? লিউ বিস্মিত চোখ নিয়ে তার চাইনিজ প্রনানসিয়েশনে ইংরেজিতে বলল, আই অ্যাম নট শিওর। আমি বললাম, খুব সম্ভবত ওগুলো লাইট। দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে অমৌসুমে ফল ফলানোর কোনো কৌশল। কারণ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. মামুনুর রশীদ কন্দাল ফসল আলুর বীজ উৎপাদন নিয়ে কাজ করছিলেন। আমি সে সময় তাঁর গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য গিয়েছিলাম। তখন দেখেছি লাইটের আলো ব্যবহার করে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর কাজ করছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ধারণা করলাম, ওগুলো লাইট হতে পারে।
আমরা গাড়ি নিয়ে বাগানটিতে প্রবেশ করলাম। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম সত্যি সেগুলো এলইডি লাইট। এক তরুণ উদ্যোক্তা, নাম লি ৪০ একর জমি লিজ নিয়ে বিশাল এ ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। এলইডি বাতি লাগিয়ে তিনি সত্যি সত্যি দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর ফলে লাভও পাচ্ছেন। অমৌসুমেও পাচ্ছেন ফল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ঠিক ৬টায় অটোমেটিক জ্বলে উঠল বাতিগুলো। দারুণ প্রযুক্তিটি সত্যি পাল্টে দিয়েছে ড্রাগন ফল উৎপাদনে হিসাবনিকাশ। প্রতিটি সারিতে মৌসুম শেষে নতুন করে পসরা সাজিয়ে এসেছে ড্রাগন ফল। শুধু বাতির সাহায্যে দিনের দৈর্ঘ্য একটু বাড়িয়ে দিয়েই চার মাসের জন্য ভরপুর ফলন পাওয়ার এক উত্তম ব্যবস্থা। এটি এলইডি বাল্বের এক জাদু।
সেই প্রতিবেদন টেলিভিশনে প্রচারের পর দেশে অনেকেই এলইডি বাতি ব্যবহার করে অমৌসুমেও ড্রাগন ফল উৎপাদন শুরু করেছেন। সেগুলোও আমি টেলিভিশনে তুলে ধরেছি। নওগাঁর হাফানিয়ার আবুল কালাম আজাদ নামের প্রকৌশলী তাঁর মোট ৪৫ বিঘা জমিতে ড্রাগনবাগানের ২০ বিঘায় ব্যবহার করছেন এলইডি লাইট। হৃদয়ে মাটি ও মানুষে চীনের পর্বটি দেখে তিনিও শুরু করেন লাইট ব্যবহার। এখন অমৌসুমে ফসল উৎপাদন করে বেশি লাভ পাচ্ছেন। জহিরুল ইসলাম এ বছর অমৌসুমে ফল পেতে বাগানটিতে যুক্ত করেছেন ৭০০ এলইডি লাইট। দেখলাম শীতেও জহিরুলের বাগানে ঠিকই ভরে আছে ড্রাগন ফুলে। অমৌসুমেও মিলবে ফল।
এলইডি লাইটের আলোয় বাগানব্যবস্থাপনা দেখাব বলে আমরা সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা করলাম। দিনের আলো নিভে এলেও বাগানটিতে জ্বলে উঠল নতুন এক সম্ভাবনার আলো। দুই বছরে বিনিয়োগের বেশির ভাগই উঠে এসেছে। জহিরুল আশা করছেন আগামী বছর বিনিয়োগ তুলে লাভের মুখ দেখবেন।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়ে আছে ড্রাগন ফলের বিশাল বাজার। সেই বাজারে প্রবেশ করতে কৃষির শুদ্ধচর্চা নিশ্চিত করা জরুরি। জরুরি উদ্যোক্তাদের পথটা মসৃণ ও সুন্দর করে তোলা জরুরি। প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে তদারকিও।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব