জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার সাবের আলী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে দেখেন ওষুধ তার শরীরে কাজ করছে না। ২০টি অ্যান্টিবায়োটিকের টেস্ট দিলে দেখা যায়, রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর বা রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছে। তারপর আরও ২০টি টেস্ট দিলে দেখা যায়, সেগুলোও অকার্যকর তার শরীরে। এরপর সব অ্যান্টিবায়োটিক টেস্ট দিয়ে দেখা যায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই তার শরীরে কাজ করছে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তুষার মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রায়ই সিআরও (কার্বাপেনেম রেজিস্ট্যান্স অর্গানিজম) শনাক্ত হচ্ছে। যেটা খুবই শঙ্কাজনক। কারণ, সর্বোচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক যখন রেজিস্ট্যান্স হওয়া শুরু করে তখন যে কোনো ধরনের অপারেশন-পরবর্তী ইনফেকশন-সংক্রান্ত জটিলতা প্রকট হয়। গ্রামাঞ্চলে পল্লী চিকিৎসক, কবিরাজ এমনকি ওষুধের দোকানদাররাও এ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক অযাচিতভাবে সামান্য জ্বর, কাশিতে ব্যবহার করছেন। ফলে এ জীবাণুগুলো রেজিস্ট্যান্স হয়ে ভিন্ন রূপে নিজেদের প্রকাশ করছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোগী এখন নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় ও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা মহামারির মতো বিপজ্জনক। অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়লে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা থাকবে না। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের জাতীয় ওষুধ প্রতিরোধী জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ৮২-৮৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। গড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার ৫০ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার বেড়েছে ১১ শতাংশ। হাসপাতালের আইসিইউর রোগীদের ক্ষেত্রে লিনেজোলিড জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার ৭০ শতাংশ; যা বহির্বিভাগে প্রতিরোধের হার ৮২ শতাংশ। এখানে কার্বাপেনেমের মতো ওষুধের প্রতিরোধী হার ৮৪ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুওয়ার্ডশিপ’ নামে মাসিক সেন্ট্রাল সেমিনারে প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, বিএসএমএমইউ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৫২ শতাংশ রোগী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স।
বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আছে যেগুলো একেবারে শেষ ধাপ হিসেবে রিজার্ভ করে রাখা হয়েছে। সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে একান্ত বিপদে না পড়লে এ রিজার্ভ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখছি অহরহ এসব রিজার্ভ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। যেগুলো সাধারণত সর্বোচ্চ মুমূর্ষু অবস্থায় আইসিইউতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া উচিত, সেগুলো এখন হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডেই ব্যবহার করতে হচ্ছে। গবাদি পশুর ফার্মে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বিপদ আরও বাড়াচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক ড. লুৎফুল কবীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ভয়াবহ আকারে বাড়ছে। অসাধু চিকিৎসকরা অনেক সময় একাধিক ওষুধ কোম্পানিকে খুশি করতে একই রকমের বিভিন্ন কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। ওষুধের দোকানদাররাও নিজেদের ইচ্ছামতো প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছেন। রোগীরাও অসচেতনতার কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পন্ন করছেন না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আমরা রিজার্ভের যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো এখনই ব্যবহার করে ফেলছি, এর পরে কিন্তু আমাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তখন দেখা যাবে অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণ সর্দি-জ্বরে কাজ করবে না। সামান্য অসুখবিসুখেই আমাদের প্রাণ হারাতে হবে।’