এক বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে নারী কর্মী বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এতে মোট নারী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৬০ শতাংশে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে দিনদিন বৃদ্ধি পেয়েছে নারীর পদচারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ব্যাংক খাতে ক্রমেই বাড়ছে নারীদের অংশগ্রহণ। গত বছর ব্যাংকের মোট কর্মী ৫.১৭ শতাংশ বাড়লেও নারী কর্মী বেড়েছে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, সাবলীল পরিবেশ, ভালো বেতন কাঠামো, মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা সুবিধা থাকায় ব্যাংকের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন বাংলাদেশের নারীরা। তবে সব খাতে এমন অবস্থা নেই। কমবেশি সব চাকরিতেই চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দিনদিন সেবা খাতে নারীদের অবদান বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ওপর ভর করে ব্যাংক খাতে মোট নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে ব্যাংক খাতের মোট নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৪৬ জন। আর এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সাল শেষে নারীদের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ হাজার ৬৪৯ জনে পৌঁছেছে। সেই হিসাবে এক বছরে নারী কর্মী বৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে ব্যাংকের মোট কর্মীর সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৬৯৬ জন থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৫ জনে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে এখন ব্যাংক খাতের প্রারম্ভিক পর্যায়ে কাজ করছেন এমন নারীর সংখ্যা ১৮.৮৭ শতাংশ। মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৫.৯৬ শতাংশ। আর ব্যাংকের উচ্চ স্তরে নারী কর্মীর অংশগ্রহণ ৯.৭৩ শতাংশ। ব্যাংকে তিন স্তরে নারী কর্মীর অংশগ্রহণে এই সংখ্যা গত তিন বছরে অল্প অল্প করে বেড়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকের বোর্ড বা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ খানিক বেড়ে ১৩.৬১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষে এই হার ছিল ১৩. ৫১ শতাংশ। দেশে বর্তমানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১৯টি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারিভাবে কিছু শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। কর্মজীবী নারী যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজেদের ভূমিকা রাখতে পারে সে জন্য ১৯৯১ সালে নারীর নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে কাজ করার জন্য সরকারিভাবে প্রথমবার ডে কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এতগুলো বছরেও উন্নতমানের কোনো সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নির্মিত হয়নি। যে কয়টি আছে সেগুলোর মান নিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। কিছুদিন আগেই ঢাকার আজিমপুরে একটি সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রে ১১ মাস বয়সি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোয় যে পরিমাণ জনবল থাকা প্রয়োজন তা নেই। তার ওপর সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন নির্ধারিত থাকায়ও বিপাকে পড়তে হয় কর্মজীবী মায়েদের। কারণ বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্রেই এক দিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। বেসরকারি মালিকানায় বেশ কিছু দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে উঠলেও সেগুলোর মানও শতভাগ সন্তোষজনক নয়। তার ওপর আবার অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিছু বেসরকারি ডে কেয়ার শিশুদের খাবারের দায়িত্ব নিলেও বেশির ভাগই তা এড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে ঘড়ির কাঁটা ধরে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিশুদের সেবা দেওয়ার সময় নির্ধারিত থাকায় জ্যামের নগরীতে সন্তান সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান মায়েরা। আর এসব বাধা পেরিয়েই নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। অবদান রাখছেন দেশের সার্বিক উন্নয়নে। ব্যাংক খাতের উপস্থিতি তার প্রমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ব্যাংক খাতে উচ্চপদ অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নারী এখনো হাতে গোনা।
দেশে বর্তমানে পরিচালিত ৬১ ব্যাংকের মধ্যে সম্প্রতি দুটি ব্যাংকে নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সে হুমায়রা আজম নামে একজন নারী এমডি আছেন। যদিও এর আগে তিনি ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ছিলেন। ডিএমডি পদেও বেশ কয়েকজন নারী রয়েছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত দুই দশকে মেয়েদের পড়াশোনার হার অনেক বেড়েছে। এর ফলে পড়াশোনা শেষ করে মেয়েদের অনেকেই ব্যাংকিং খাতে ক্যারিয়ার গড়ছে। কিন্তু বিয়ে এবং সন্তান লালন-পালনের প্রতিবন্ধকতার কারণেই অনেকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে মাঝপথে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার হার বাড়ছে।