যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রয়েছে, সেসব দেশের মুদ্রার তুলনায় টাকার অতিমূল্যায়নের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার দুটি মূল উৎস রপ্তানি ও রেমিট্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স সহায়তা করলেও বর্তমান রিজার্ভ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রা মূল্যায়নের প্রধান সূচক বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার (আরইইআর) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১০০ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে অক্টোবর মাসে ১০২ দশমিক ৯৭ এবং নভেম্বরে ১০৪-এ পৌঁছায়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এর অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, টাকার অতিমূল্যায়ন রপ্তানিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
টাকা ও ডলারের বর্তমানে বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) আগামীতে সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা জানান, ক্রলিং-পেগ সিস্টেম আগামী ১২ জানুয়ারি থেকে আরও নমনীয় করা হবে। এই পদ্ধতি কার্যকর হলে প্রতিদিন দুইবার বিনিময় হারের তথ্য প্রকাশ করা হবে এবং বাজারকে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হবে। এই পদ্ধতি চালু করা হলে বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হারকে (আরইইআর) ১০০-এর কাছাকাছি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে, যা রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের জন্য সহায়ক হতে পারে বলেও মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে, যা ছিল গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার অস্থির করতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতির ভাষায়, বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার কোনো দেশের মুদ্রার ভারসাম্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ১০০-এর নিচে বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং আমদানি ব্যয়বহুল করে তোলে, অন্যদিকে ১০০-এর ওপরে গেলে তার বিপরীত ঘটে। বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার যেমন চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার (আরইইআর) হিসাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আরইইআর দেশের শীর্ষ ১৫টি বাণিজ্য অংশীদারের মুদ্রা এবং মূল্যস্ফীতি হারের ভিত্তিতে করা হয়। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার স্তর বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হ্রাস করছে। এ বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক মাস আমরা একটি অনুকূল পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম কিন্তু এখন পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে। ফলে রপ্তানি আয় আরও হ্রাস পেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। মাসরুর রিয়াজ বাস্তব কার্যকর মুদ্রা বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাংলাদেশের বাণিজ্য অংশীদারদের তুলনায় উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং শিথিল আমদানি নীতির ফলে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধিকে উল্লেখ করেন। তবে এই অর্থনীতিবিদ আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় পণ্যের, বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি কমবে। শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদন সাম্প্রতিক উত্তপ্ত বাজারকে শান্ত করেছে। তবে অনেক স্থানীয় শিল্প পণ্যের উৎপাদন এবং আমদানি করা পণ্য এখনো ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন।