শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, গোটা বিশ্বের বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি ব্যক্তি পরিসরেও এক চিরস্থায়ী মুদ্রা কীভাবে হয়ে উঠলেন উত্তম কুমার, সেই বৃত্তান্তে নিত্যনতুন আলো পড়ছে আজও। তাঁর মৃত্যুর ৪৪ বছর কেটে যাওয়ার পরেও যে আলো, উত্তম কুমারের হাসির মতোই একসঙ্গে সম্মোহক এবং নির্মল।
তখন নাম অরুণ কুমার, নায়ক হওয়ার বাসনায় প্রাণপণ লড়াই চলছে তাঁর। কিন্তু একের পর এক ফ্লপের পর প্রদীপ কুমারের ব্যস্ততার কারণে হাতের কাছে নায়ক না পেয়ে ১৯৫০ সালে ‘মর্যাদা’ ছবিতে কাজ দিতে রাজি হলেন পরিচালক সরোজ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু অদ্ভুত এক শর্তে। ওই অপয়া স্ক্রিন নামটি বদলাতে হবে। নতুন নাম হবে অরূপ কুমার। অরুণ ‘নামে কী আসে যায়’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেটে। কিন্তু ছবির আবারও সুপার ফ্লপ হওয়া আটকাতে পারলেন না অরূপ কুমারও। ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা তখনই তৈরি হলো স্টুডিওতে। তবে এর মধ্যেও সামান্য রুপালি রেখা ছিল বলেই ‘মর্যাদা’ ফ্লপের পরেও আরও দুই বছর স্টুডিওপাড়ায় টানতে পেরেছিলেন উত্তম। সাউথ সিঁথি আর বরানগরের ক্রসিংয়ের কাছে ছিল তখনকার ডাকসাইটে এম পি স্টুডিও। পাহাড়ী সান্যাল এবং আরও কিছু ব্যক্তির সুপারিশে সেখানে মাসিক ৪০০ টাকা বেতনে স্টাফ আর্টিস্টের চাকরি পেয়ে ডুবন্ত সংসারে হাল ধরেছিলেন সেদিন অরুণ। সেখানে তখন ‘সহযাত্রী’ ছবির কাজও শুরু হবে নতুন পরিচালক গোষ্ঠী ‘অগ্রদূত’-এর পরিচালনায়। ‘কামনা’য় (১৯৪৯) তাঁর নাম ছিল উত্তম চ্যাটার্জি। সব ফেলে নতুন নাম নিলেন অরুণ। উত্তম কুমার। দীর্ঘদিন খরার পর অলক্ষ্যে নিয়তি নির্ঘাত মুচকি হেসেছিল সেদিন। তবে চলল না ‘সহযাত্রী’ এবং ওই ১৯৫১ সালে তৈরি আরেকটি ছবি ‘সঞ্জীবনী’ও। দ্বিতীয় এ ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সন্ধ্যারাণী। ছবি আবারও ফ্লপ। আনন্দবাজারে একটি লাইন অবশ্য লেখা হয়েছিল সমালোচনায়, ‘উত্তম কুমার স্থানে স্থানে অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন’। প্রবল ব্যর্থতার মধ্যে এ স্বীকৃতি তাঁকে সামান্য হলেও অক্সিজেন দিয়েছিল। এরপর ১৯৫২ সালেই রিলিজ হলো ‘বসু পরিবার’। যার ওপর বাকি জীবনের শেষ দাওটা লাগিয়ে বাড়িতে বলেই দিয়েছিলেন উত্তম- আর নয়, এ ছবিও ব্যর্থ হলে ফিরে যাবেন কেরানিজীবনে। মেনে নেবেন, অভিনয়ে এসেছিলেন নেহায়েতই অল্প বয়সের আবেগ উন্মাদনায়। মেনে নেবেন কোনো প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়া সমুদ্রে জাহাজ চালাতে নেমে পড়া ঘাট হয়েছে তাঁর। অবশেষে ভাগ্যদেবী উত্তমের প্রতি বুঝি সুপ্রসন্ন হলেন। উনিশ শ বাহান্ন সালে ‘বসু পরিবার’, তিপ্পান্নতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ রিলিজের পর কী ঘটেছিল তা আজ ইতিহাস। বাংলা সিনেমা শুধু নয়, সমগ্র বঙ্গ জাতির অবশ্য পাঠ্য সিলেবাসের মধ্যে তা ঢুকে গেছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, গোটা বিশ্বের বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি ব্যক্তিপরিসরেও এক চিরস্থায়ী মুদ্রা কীভাবে হয়ে উঠলেন উত্তম কুমার, সেই বৃত্তান্তে নিত্যনতুন আলো পড়ছে আজও। তাঁর মৃত্যুর ৪৪ বছর কেটে যাওয়ার পরেও যে আলো উত্তম কুমারের হাসির মতোই একসঙ্গে সম্মোহক এবং নির্মল।
মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে অনেক নায়িকা অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন শকুন্তলা বড়ুয়া। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম নায়ক উত্তম কুমার। প্রচুর নায়কের সঙ্গে কাজ করেছি আমি এত বছরের অভিনয়জীবনে, কিন্তু দ্বিতীয় কাউকে বলতে পারব না যিনি উত্তম কুমারের ধারেকাছে এসেছেন। ওঁর গাম্ভীর্য, হাঁটাচলা, কথা বলা মাপে মাপে। এখনকার হিরোরা তো সবাই চিৎকার করে কথা বলেন। আজকাল গাড়ি থেকে নেমেই আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে হাই বলে একটা লাফ দেয়। যাতে মিডিয়া দেখতে পায় এই তো। উত্তম কুমার ছিলেন হিমালয়। উনি সবসময় গাড়ি থেকে নেমে মাথা নিচু করে তাকিয়ে হেঁটে যেতেন। কারণ উনি তো ছিলেন ওপরের মানুষ। ওঁকে সবাই মাথা উঁচু করে দেখত। এ কারণেই উত্তম কুমারের বিকল্প আজও এলো না, আসবেও না। আমার চোখে উনি একটা আইডিয়াল মানুষ। আমি যখন এসেছিলাম ইন্ডাস্ট্রিতে আরও অনেক বেশি সুন্দরী ছিলাম। কই উত্তম কুমার তো আমার থেকে কোনো সুযোগ নেননি। নেভার। বরং আগলে রেখেছেন। প্রথম দিন এনটি ওয়ানে কাজ করছি। আমার রুমের বিপরীতে উত্তম কুমারের মেকআপ রুম। আমি শুনতে পারছি উত্তম কুমার ফোন করে বেণুদিকে (সুপ্রিয়া দেবী) বলছেন- ‘বেণু, আমার লাঞ্চে যখন খাবার আসবে তার সঙ্গে যেন শকুন্তলারও খাবার আসে।’ এটা কোনো হিরো আজ পর্যন্ত বলেছেন বা করেছেন? আমি তখন নতুন একটি মেয়ে। কেউ আমায় জানে না, কেউ আমায় চেনে না। আমি তো দেখিনি কোনো নবাগত নায়িকাকে কোনো সুপার স্টার হিরো এ সম্মান দিচ্ছেন। উত্তম কুমার এ জন্যই আলাদা। মানে ভাবা যায় না ওঁনার মনটা কত বড় ছিল। আরও বলব, আমাকে যেভাবে উনি অভিনয়ে হেল্প করেছেন, ওই অন্ধ মেয়ের রোলে প্রথম দিন প্রথম শটে। পৃথিবীর কেউ দেখতে পেল না, আমার কানের কাছে পায়চারি করতে করতে উনি বলে দিলেন ‘তুমি ডান পা দিয়ে এগোবে আর আড়াই পা গিয়ে তুমি আমার বাঁ কানের দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে বলবে দাদা চা।’ ফার্স্ট শট একবারে ওকে। সবাই ভাবল নতুন মেয়ে, ফার্স্ট শট ওকে হয়ে গেল, বাব্বা। কিন্তু কেউ জানল না, ওকে হওয়ার টিপসটা দাদা দিয়ে দিয়েছিলেন। পরে আমি দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা আমায় বললেন কেন? দাদা বললেন মুচকি হেসে (কখনো হে হে করে হাসতেন না) তুমি আড়াই পা এগিয়ে আমার বাঁ কানের দিকে তাকালে আলোটা তোমার মুখে পড়বে।
দাদা আজ চলে গেছেন ৪৫ বছর। আজও তিনি অমলিন, অনন্তকালের মহানায়ক আর মানুষ উত্তম কুমার।’