মহানায়ক উত্তম কুমার বাঙালির চিরদিনের প্রিয় নায়ক, এ নায়কের প্রয়াণ ঘটেছে প্রায় ৪৫ বছর হলো। আজও তিনি বাঙালির মনে চিরঞ্জীব। তিনি যেমন অভিনয়ে রেখে গেছেন অনন্য স্বাক্ষর, তেমনি তাঁর জীবনের অনেক মজার গল্প রয়ে গেছে অন্তরালে। এমন দুটি অন্তরালের গল্প হলো-
উত্তমের শেষ ইচ্ছা পূরণ করেননি সুচিত্রা
শুধু পর্দায় নয়, সুচিত্রা নাকি সত্যিই মন দিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমারকে। কিন্তু সেই প্রেমকে গোপনে রেখেই অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। উত্তম-সুচিত্রা। এ জুটির ম্যাজিককে টেক্কা আজও দিতে পারেন না কেউ-ই। সেই ‘হারানো সুর’ ছবির অলোক মুখোপাধ্যায় ও রমা মুখোপাধ্যায়ের প্রেম হোক, কিংবা ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউনের সঙ্গে কৃষ্ণেন্দু। বাংলা চলচ্চিত্র তথা বাঙালিদের কাছে উত্তম-সুচিত্রা প্রেমের অনুপ্রেরণা। এমনকি সে সময় রটেই গিয়েছিল শুধু পর্দায় নয়, সুচিত্রা নাকি সত্যিই মন দিয়েছিলেন উত্তমকে। কিন্তু সেই প্রেমকে গোপনে রেখেই অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
সময়টা ১৯৭১। মুক্তি পেয়েছে উত্তম-সুচিত্রার ‘আলো আমার আলো’ ছবিটি। এ ছবিতে সুচিত্রার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন উত্তম। এমনকি ফোন করে সেই মুগ্ধতার কথা মহানায়িকাকেও জানিয়েছিলেন। আর সঙ্গে আবদার করেছিলেন সিনেমার ফ্লোর নয়, একান্তে একবার দেখা করার। কিন্তু তখন সিনেমাপাড়ার সবচেয়ে ব্যস্ত নায়িকা তিনি, হাতে তাঁর একের পর এক ছবি। শুটিং থেকে কিছুতেই সময় বের করতে পারেননি। উত্তমের সঙ্গে সেই সাক্ষাৎ আর হয়নি। কিন্তু ততদিনে জীবন এগিয়ে গেছে।
২৪ জুলাই, ১৯৮০। দুম করেই গোটা দুনিয়া খবর পেল মহানায়ক আর নেই। উত্তমের মৃত্যুর খবর কানে যেতেই ভেঙে পড়েছিলেন সুচিত্রা। হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, শেষ দেখাও দেখবেন না উত্তমকে। তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রে শোনা যায়, চোখে রোদ চশমা পরে, অনুরাগীদের থেকে নিজেকে লুকিয়ে উত্তমকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন সুচিত্রা। সেটিই ছিল রিনা ব্রাউন ও কৃষ্ণেন্দুর শেষ দেখা। এর পরই অন্তরালে চলে যান মহানায়িকা।
রাতভর সাবিত্রীর বাথরুমে উত্তম কুমার
রাতভর সাবিত্রীর বাড়ির বাথরুমে লুকিয়ে ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার, কিন্তু কেন? কী ঘটেছিল সেই রাতে? আসলে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে কত ঘটনা ঘটে, তার অনেকটাই রয়ে যায় অন্তরালে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু গল্প সামনে আসে, যা শুনে অবাক হন অনুরাগীরা। এমনই এক মজার ঘটনা ঘটেছিল মহানায়ক উত্তম কুমার এবং কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। একবার সাবিত্রীর বাড়িতে গিয়ে চরম অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন উত্তম কুমার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, সারারাত তাঁকে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির বাথরুমেই কাটাতে হয়েছিল। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন খুবই রাগী ও কঠোর নিয়মকানুনের মানুষ। তার একটা নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল- রাত ১০টার মধ্যে বাড়ির সবাইকে ফিরতেই হবে। এ নিয়ম অমান্য হলেই শুরু হতো অশান্তি। বাড়ির গেট বন্ধ হয়ে যেত তালা দিয়ে, যা খুলতেন একমাত্র সাবিত্রীর বাবা।
একদিন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে উত্তম কুমার এসেছিলেন তাঁর বাড়িতে। আড্ডা জমে উঠেছিল। কিন্তু কখন যে ঘড়ির কাঁটা রাত ১০টা ছুঁয়ে ফেলেছিল তা বোঝা যায়নি। যখন খেয়াল হলো তখন দেখা গেল সাবিত্রীর বাবা বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। ফলে উত্তম কুমারের আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সাবিত্রীর বাবার সামনে উত্তম কুমারকে দেখলে বিপদ অনিবার্য। তাই নিজের সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়েই বাথরুমে আশ্রয় নিতে হয় মহানায়ককে। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় নিজেই এক সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে এ ঘটনা ফাঁস করেছিলেন। তিনি বলেন, উত্তমদা বাথরুমে ঢুকে বললেন, ‘সাবু, আমি এখানেই আছি। বাবাকে আমি খুব ভয় পাই।’ যত বড় তারকাই হন না কেন, মা-বাবার শাসনের কাছে সবাইকেই নত হতে হয়, এ ঘটনা যেন সেটারই আরেকবার প্রমাণ। উত্তম কুমারের মতো একজন মহানায়কও সেই রাতে এক সাধারণ ছেলের মতো ভয়ে বাথরুমে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ গল্প আজও টলিউডের অন্দরমহলে একটা মিষ্টি ও মজার ঘটনা হয়ে রয়েছে।