ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি একইভাবে না ঘটলেও তার অন্তর্নিহিত কারণ ও শিক্ষা একই থাকে। তাই ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির কথা সবার আগে সামনে আসবে। শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা- ইতিহাস যেন একই পথে হেঁটেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতাপূর্ব জনপ্রিয়তার পারদ স্বাধীন বাংলাদেশে নড়বড়ে হয়ে যায়। তিনি তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কেন, কার বা কাদের কারণে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নিয়েছেন বলে মনে হয়নি। তাদের অনেকের কার্যক্রম দেখে মনে হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পুনরায় সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত দিনগুলোর চিত্রও তারা ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বেমালুম ভুলে যায়। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে তাদের শাসনকালের ইতিহাস ঘাঁটলে সেই কথার সত্যতা পাওয়া যাবে। যার পরিণতিতে ২০০১ সালে তাদের আবারও ক্ষমতা হারাতে হয়।
সৃষ্টিকর্তা আবারও আওয়ামী লীগের প্রতি মুখ তুলে চেয়েছিলেন ২০০৮ সালে। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসে। কিন্তু সেই ক্ষমতা গ্রহণের পর তারা গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। সীমিত পরিসরের গণতান্ত্রিক ধারায় আওয়ামী লীগের গাড়ি আটকে যায়। সেই আটকানোর পরিণতি কতটা ভয়াবহ পতন ডেকে আনতে পারে, তা সারা বিশে^র মানুষ দেখেছে গত বছরের জুলাই-আগস্টে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেছে। তারা ছিটকে পড়ে ক্ষমতার বাইরে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আজ গণহত্যায় বিচারের মুখোমুখি। অতি আত্মবিশ^াস ও আত্মন্ডঅহংকার আওয়ামী লীগের এই পরিণতির জন্য দায়ী।
শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলের খানা তল্লাশি করলেও একই পরিণতির শিক্ষা পাওয়া যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের অনেকের এক রূপ, আর ক্ষমতায় গেলে তাদের অনেকের ভিন্ন রূপ চোখে পড়ে। ক্ষমতা যেন তাদের অন্ধ করে দেয়। তখন অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করেন না। ফলে তার পরিণতিতে পতন ঘটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের অনেকেই ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অতীতকে ভুলে যান। তাদের বয়ান তারা পাল্টে ফেলেন।
যদিও তারা মুহাম্মদ বখতিয়ার আল খলজি থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজি বাংলার তৎকালীন শাসক রাজা লক্ষ্মণ সেনের শাসিত নদীয়ায় বিজয়ী বেশে প্রবেশ করেন। এর মাত্র দুই বছর পর অর্থাৎ ১২০৬ সালে তাঁকে ইতিহাস সেরা পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়। ১২০৪ সালে নদীয়া বিজয়ের কারণে বখতিয়ার খলজির সঙ্গে থাকা সৈন্যরা ও তাঁর পরিবারের চোখে তিনি নায়ক ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মধ্যে তাঁর তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হলে তিনি তাঁদের কাছে খলনায়কে পরিণত হন। ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দিন সিরাজ তাঁর ‘তবকাত নাসিরি’ গ্রন্থে লিখেছেন : তিব্বত অভিযান থেকে পরাজিত হয়ে দেওকোটে ফেরত আসার পর বখতিয়ার খলজি অত্যধিক মানসিক যন্ত্রণায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিব্বত অভিযানে নিহত সৈন্যদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা হলে তিনি লজ্জায় ঘোড়ায় চড়া থেকে বিরত থাকতেন।
মিনহাজের উপর্যুক্ত দাবি থেকে মনে হতে পারে যে বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযানে নিহত সৈন্যদের স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি সম্মানার্থে ঘোড়ায় চড়তেন না। কিন্তু প্রকৃত কারণ ছিল ভিন্ন। তাঁর পক্ষে প্রকৃতপক্ষে ঘোড়ায় চড়া সম্ভব হতো না। মিনহাজের লেখা থেকেই তা স্পষ্ট হয়। মিনহাজের মতে, যখনই বখতিয়ার খলজি ঘোড়ায় চড়তেন তখনই তিব্বত অভিযানে নিহত সৈন্যদের স্ত্রী-সন্তানরা ঘর ও রাস্তায় থাকা সব লোক যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন। বখতিয়ার খলজিকে অভিশাপ দিতেন এবং গালিগালাজ করতেন। বাধ্য হয়ে তিনি ঘোড়ায় চড়তে পারতেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে একসময় তিনি ঘর থেকেই আর বের হতেন না।
১২০৪ সালে যে বখতিয়ার খলজি নায়ক বেশে নদীয়া প্রবেশ করেন সেই বখতিয়ার খলজির অমন পরিণতির কারণ ছিল নদীয়া বিজয় তাঁকে উচ্চাভিলাষী করে তুলেছিল। পরাক্রমশীল লক্ষ্মণ সেনের বিরুদ্ধে মাত্র ১৭-১৮ জন সৈন্য নিয়ে বিশাল জয় পাওয়ায় তিনি আত্ম-অহংকার আত্মগরিমায় ভুগছিলেন। অতি আত্মবিশ^াসে তিনি তিব্বত অভিযানে যান এবং ওই অভিযানে তাঁর পুরো সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। শতাধিক সৈন্য নিয়ে তিনি দেওকোটে ফিরে আসেন।
তিব্বতে অভিযানের আগে যে ধরনের গোয়েন্দা তথ্য দরকার ছিল তা বখতিয়ার খলজির কাছে ছিল না। তাঁর তিব্বত অভিযানের পুরো সামরিক রণনীতি ও রণকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে তিনি তিব্বত সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। ফলে প্রকৃতি ও জনপ্রতিরোধে পড়ে তাঁর পরাজয় ঘটে। আর তাঁর চূড়ান্ত পরাজয় কামরূপে নিশ্চিত হয়। তাঁর দুইজন আমিরের অন্তঃকলহের কারণে তিব্বতের পর কামরূপেও তাঁর পরাজয় ঘটে।
মিনহাজের বিবরণ থেকে জানা যায়, বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযান থেকে ফেরত আসার পথ শত্রুমুক্ত রাখতে কৌশলগত সামরিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিল হাকো সেতু পাহারায় দুজন আমিরকে প্রচুর সৈন্যসহ নিযুক্ত করেন। ওই আমিরের মধ্যে একজন ছিলেন তুর্কি দাস। অন্যজন ছিলেন খলজি আমির। বখতিয়ার খলজি তিব্বতের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর ওই তুর্কি ও খলজি আমির নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ওই বিবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, শেষ পর্যন্ত তা সামরিক সংঘাতে গড়ায়। ওই সংঘাতের ফলে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ সিল হাকো সেতু ও সেতুসংলগ্ন রাস্তার পাহারা ছেড়ে চলে যান। ওই সুযোগে কামরূপের রাজা পৃথু সেতুটি ধ্বংস করে দেন। ফলে তিব্বত অভিযান থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পথে খলজির পক্ষে নির্বিঘ্নে দেওকোটে ফেরত আসা সম্ভব হয়নি। তিনি কামরূপের রাজা কর্তৃক আক্রান্ত হন। ওই আক্রমণের ফলে তাঁর পুরো সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। কামরূপের রাজা পৃথুর হঠাৎ আক্রমণে শতাধিক সৈন্যসহ বখতিয়ার খলজি প্রাণরক্ষা করতে সক্ষম হন। ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি তিব্বত অভিযানে যান। কিন্তু দেওকোটে ফিরে আসেন শতাধিক সৈন্যসহ। বাকিরা তিব্বত ও কামরূপে প্রাণ হারান।
১২০৪ সালের নদীয় বিজয়ের নায়ক বখতিয়ার খলজি মাত্র দুই বছরের মধ্যে ১২০৬ সালে খলনায়কে পরিণত হন। তাঁর ওই নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হওয়ার ঘটনার মধ্যে রাজনীতিবিদদের জন্য ঐতিহাসিক শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনার পরম্পরা বলে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা কখনো বখতিয়ার খলজির খলনায়কে পরিণত হওয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নেননি। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের শিক্ষার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একদা যিনি নায়ক হিসেবে জনতা কর্তৃক নন্দিত হয়েছেন, পরবর্তীকালে তিনিই আবার জনতার কাছে খলনায়কে পরিণত হয়ে নিন্দিত হয়েছেন। অপ্রিয় হলেও বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে উপর্যুক্ত কথার সত্যতা যেন বারবার যুগে যুগে ফিরে ফিরে এসেছে।
♦ লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়