চারপাশে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষবাস হচ্ছে অবাধে। গ্রাম ও শহরে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত, কখন কোন কথা বলে বিপদে পড়তে হয়, তার কোনো ঠিক নেই। মানুষের সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষ নতুন নয়। ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে এই বিষ ছিল। একশ্রেণির মানুষ শাস্ত্রের নামে, রাজনীতির নামে, ধর্মের নামে বিষবাষ্প অন্তরে বহন করেছে এবং বিষিয়েছে বাতাস। সবলের ওপর দুর্বলের জুলুম, কালোর ওপর সাদার শ্রেষ্ঠত্ব, ব্রাহ্মণ্যবাদ, নারী ও শিশুপীড়ন- এগুলো তো ছিলই কাল ও কালান্তরে। আবার এই মানুষই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং জয়যুক্ত হয়েছিল কিছুকালের জন্য হলেও। আবার পরিস্থিতি যেই কে সেই হয়ে গেছে।
আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগাবসানে আল্লাহর রসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) সত্যের বাণী নিয়ে আসেন। তিনি ত্যাগ, ক্ষমা ও ঔদার্যের পথে মানুষকে আহ্বান করেন শান্তির ধর্ম ইসলামের ছায়াতলে। বিদায় হজের ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, সাদাকালোর কোনো প্রভেদ নেই। পবিত্র কোরআনেও সমাজে অশান্তি সৃষ্টি না করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একাধিক আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর উম্মত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে, আমাদের সমাজে আমরা এমন অনেকে আছি, যারা মুখে যে জীবনবিধানের কথা বলি, কার্যক্ষেত্রে করি তার উল্টো। ধর্মের কথা বলে অধর্ম করি, গণতন্ত্রের কথা বলে অগণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করি, বাক ও ব্যক্তির স্বাধীনতার কথা বলে দুটোই হরণ করি। নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা দুর্মতির কাছে সুমতিকে সমর্পণ করে দিই অবলীলায়।
জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে আশা জেগেছিল গত ছয় মাসে তার অনেকটাই যে মলিন হয়ে এসেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। জুলাই ও আগস্টের দেয়াললিখনগুলো পাঠ করলেও সেই সময়ের জনপ্রত্যাশার ধরনটা বেশ বুঝতে পারা যায়। একটি দেয়াললিখন দেখলাম, কাঁচা হাতে ছেলেরা লিখেছেন, ‘ভালো মানুষ, ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ’। তার পাশেই লেখা রয়েছে, ‘আসুন নিজেদের সংস্কার করি’। দেয়ালে দেয়ালে যে ছেলেমেয়েরা এসব বাণী লিখে রেখেছেন, তাদের বেশির ভাগই এখন আর রাজপথে নেই, ওরা মবেও নেই। তারা সরল বিশ্বাসে উত্তাল দিনগুলোতে ভয়কে জয় করে এসব সুবচন দেয়ালে উৎকীর্ণ করেছিলেন।
জানি না, সরকারিভাবে দেয়ালচিত্রের যে অ্যালবাম বানানো হয়েছে, সেখানে এই স্বপ্নগুলোও ছাপা হয়েছে কিনা। হয়ে থাকলে বর্তমান ও অনাগত দিনের নীতিনির্ধারকদের এগুলো বারবার পাঠ করা উচিত। দুনিয়া কাঁপানো জুলাই সংগ্রামের দিনগুলোতে দেয়ালে দেয়ালে অত্যাচারী শাসক ও তার সহযোগীদের বহু বিচিত্র কার্টুন আঁকা হয়েছে, সুন্দর সুন্দর ক্যাপশন লেখা হয়েছে। ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য সেগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে যে আশার বচন আঁকা হয়েছিল প্রাচীরগাত্রে সেগুলো নিজেদের মনের দেয়ালে অমোচনীয় কালি দিয়ে লিখে রাখা দরকার।
ভালো মানুষের সমাজকে আমাদের বানিয়ে দেবে, আমরা নিজেরা যদি তা না বানাই! গত সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দেশের বরেন্য শিল্পী ইমিরেটাস অধ্যাপক রফিকুন নবীকে চারুকলায় অনুষ্ঠানের মঞ্চে উঠতে দেওয়া হয়নি। লজ্জিত, অপমাণিত শিল্পী অনুষ্ঠানস্থলে না গিয়ে ফিরে এসেছেন। রনবী নামে সমধিক পরিচিত এই শিল্পীকে মঞ্চে তুলতে নিষেধ করে নাকি বার্তা পাঠিয়েছিলেন ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য।
তিনি ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। কিন্তু এই বর্ষীয়ান ও স্বনামধন্য শিল্পীকে ডেকে নিয়ে অসম্মান করা হলো কেন? আর সহ-উপাচার্য নিজেও তো একজন শিক্ষক, তিনি আরেকজন সিনিয়র শিক্ষককে অসম্মান করলেন কেমন করে? রফিকুন নবীর সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের পুত্র প্রকৌশলী ময়নুল আবেদীনও ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি। যত দূর জানি, শিল্পী রফিকুন নবী চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের কৃতী শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের প্রতিষ্ঠানেই তাঁকে অসম্মানিত হতে হলো। এর পেছনে স্পষ্টতই রয়েছে আল মাহমুদের ভাষায় বিশবিদ্যালয়ের কোনো না কোনো ‘প-িত’ শ্রেণি। আজ কী হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের সদরে ও অন্দরে? রাজনীতির নামে, অপছন্দের সংস্কৃতি রুখে দেওয়ার বাহানায় কী চলছে শহর ও গ্রাম জনপদে। বিবিসির খবর; লালন উৎসব হতে দেওয়া হয়নি, নাট্য সপ্তাহ পালন করতে দেওয়া হয়নি, বসন্ত উৎসব হতে দেওয়া হয়নি, ঘুড়ি উৎসবেও বাধা এসেছে। এমনকি একটি গ্রামে হিজড়া-হকারদের প্রবেশ ও বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। অমর একুশের বইমেলাও রেহাই পায়নি মবোক্র্যাসির কবল থেকে।
৫ আগস্টের অব্যবহিত পরের দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে ছেলেমেয়েরা যখন শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের কারও কারও গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিতে শুরু করল, যখন বাড়িঘর পোড়ানো শুরু হলো, যখন ক্যাম্পাসে মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণকে চোর সাজিয়ে মেরে তক্তা বানিয়ে হত্যা করা হলো, আমরা তখন সোহাগ করে এসবের নাম দিলাম, মব জাস্টিস। মব অর্থই যেখানে উচ্ছৃঙ্খল জনতা, সেখানে জাস্টিস আসে কেমন করে! এখন বলা হচ্ছে ‘মব করা’ আর এই কলামে বলা হলো, মবোক্র্যাসি। ডেমোক্র্যাসিকে আঁতে মেরে দেওয়ার জন্য মবোক্র্যাসির মতো অব্যর্থ বিষের বড়ি আর হয় না। এর পেছনে খারাপ লোক ও বাজে পলিটিক্সের হাত থাকা বিচিত্র নয়।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায়; মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও মাঠের রাজনীতি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। একটি উপজেলার খবর : ইউএনওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মানববন্ধন করেছেন। এর আগে স্থানীয় রাজনীতির একাংশ থেকে উপজেলা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ; ইউএনও দুর্নীতিবাজ। নেতাদের তিনি অ্যাভয়েড করেন। পক্ষান্তরে ইউএনওর বক্তব্য; সিস্টেম করে বিনা টেন্ডারে বালুমহাল দেননি বলে ঘেরাওয়ের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরস্পরবিরোধী এই অভিযোগের দুটোই হয়তো সত্য অথবা অর্ধসত্য কিংবা সত্য নয়। তবে শেষের সত্য হলো, ওই ইউএনও বদলি হয়ে গেছেন। এ রকম আরও দুটো খবরের শিরোনাম পাঠ করা যাক। ১. অবশেষে কুষ্টিয়ার সেই ইউএও বদলি, ২. মোংলার ইউএনও বদলি। বদলিযোগ্য চাকরি; বদলি হতেই পারেন। কিন্তু এই বদলিগুলো হয়েছে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে বিরোধের জেরে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সংবাদ সন্দেশগুলো ক্যাম্পাসের হালফিল গরম নিঃশ্বাসে এরই মধ্যে বাসি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবরের শিরোনাম, ‘দফায় দফায় সংঘর্ষ’। একদিকে ছাত্রদল। আরেকদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছাত্রশিবিরও আছে। কুয়েটে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে জনসাধারণও নাকি ক্যাম্পাস সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সশস্ত্র মহড়াও দৃশ্যের বাইরে ছিল না। পরিস্থিতিদৃষ্টে আল মাহমুদের সেই কবিতার কয়েকটি লাইন পড়তে বড় ইচ্ছা হচ্ছে। তাহলে পড়া যাক; এরশাদ আমলে ক্যাম্পাস যখন রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়েছিল, যখন ছাত্ররাজনীতির নামে বিশবিদ্যালয়ে রক্তের হোলিখেলা চলছিল, তখন কবি মোনাজাত করেন,
‘তবু হে পরোয়ারদিগার
জানতে সাধ জাগে,
ঢাকা বিশবিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?’
এই কবিতা প্রকাশিত হলে সুশীলদের অনেকেই কবির নিন্দা করেছিলেন। কবিকে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কারণ উচিত কথা সবার পেটে হজম হয় না।
বিরাজমান ক্যাম্পাস পরিস্থিতিতে উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ফেসবুক পেজে আরাফাতুল ইসলাম নামের একজনের একটা স্ট্যাটাস পড়লাম। স্ট্যাটাসের অংশবিশেষ; ‘বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন বিভক্ত। কোনো রাজনৈতিক দলের একক দৌরাত্ম্য নেই আপাতত, ডেডিকেটেড মারমুখী কর্মীর সংখ্যা কাছাকাছি পরিমাণের, সব মিলিয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির যদি মুখোমুখি হয়, নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো পক্ষই সহজে পেছাবে না। উভয়ই নিজের অস্তিত্বের জ্ঞান করে মারামারি করবে। হয়তো ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে স্মরণকালের সর্বোচ্চ হতাহত ও লাশ দেখতে হবে এবার।’
যা হোক; এখন ছাত্ররা যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, তার থিম সেøাগান হচ্ছে, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।’ জনান্তিকে প্রশ্ন; ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যারা ক্যাম্পাসে সংঘাতে জড়ালেন, তারাও রাজনীতি করছেন না কি? নাকি এই পাল্টাপাল্টি মিছিল-সেøাগান ও সংঘাতের অর্ধেকটা রাজনৈতিক আর অর্ধেকটা অরাজনৈতিক? ইন্টারেস্টিং!
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া যেসব সরল কিশোর-কিশোরী, তরুণ ও তরুণী বুকভরা আশা নিয়ে দেয়ালে লিখেছিলেন, ভালো মানুষ, ভালো দেশ, স্বর্গভূমি বাংলাদেশ, তারা আজ কী ভাবছেন? যখন ময়দানে পুলিশ ছিল না, তখন যে ছেলেমেয়েরা রাজপথে ট্রাফিকের ভূমিকায় নেমে গিয়েছিলেন, তাদের মনের অবস্থার কিছুটা প্রতিফলন রয়েছে উপরিল্লিখিত ফেসবুক বয়ানের মধ্যে।
অন্তর্বর্তী সরকার, বিভিন্ন সংস্কার কমিটির সদস্য, রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটা অংশ সংস্কারের ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে চলেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে বহুত্ববাদ যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। কার্যত বহু মত, বহু পথের সম্মিলন ছাড়া গণতন্ত্র অচল। কিন্তু শহর, গ্রাম ও ক্যাম্পাসে এখন যা চলছে, তার কোনোটার মধ্যে কি বহুত্ববাদী নীতির লেশমাত্র আছে? আজ সাধারণ মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, কোনো কোনো নাম উচ্চারণ করতে ভীতসন্ত্রস্তবোধ করেন। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি. রুজভেল্টের ফোর ফ্রিডম তত্ত্বের কথা মনে পড়ে। তিনি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য যে চারটি মৌলিক অধিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন তার অন্যতম হলো, ভয় থেকে মুক্তি। ভয়ের সমাজে গণতন্ত্র বাঁচতে পারে না।
ভয় থেকে মুক্তি আমাদের মিলবে কবে, কোন শর্তে, কোন পথে?
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
e-mail: [email protected]