চিন্তা উদ্রেককারী যত বই এ পর্যন্ত পড়েছি তার অধিকাংশই খোন্দকার আবদুল আজিজের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বসে পড়া। আমার জেলা শহরের নামকরা ব্যবসায়ী ‘খোন্দকার সাহেব’ যৌবনকালে মুম্বাই নগরীতে চাকরি করতেন। সে সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে কিছুকাল কারাভোগ করতে হয়েছে। কারাজীবনের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ। বলতেন, ‘ব্রিটিশ রাজের পুলিশ তাদের অজ্ঞাতসারে আমার বিরাট একটা উপকারই করে। ওরা জেলখানায় না ভরলে বই পড়ার অভ্যাস আমার কখনোই হতো না।’
প্রচুর বিচিত্র বইতে ঠাসা খোন্দকার আজিজের লাইব্রেরি। পাঠক ইচ্ছে করলে বই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে কয়েক দিনের জন্য। বছর সাতেক এই ব্যবস্থা তাঁকে উচিত শিক্ষা দেয়। মানুষ যত মমতায় বই বাড়ি নিয়ে পড়ে ততটা নির্মমতায় তারা বই আত্মসাতে মনোযোগী। তাই খোন্দকার আবদুল আজিজের ঘোষণা- ‘বই বাড়ি নেওয়া যাবে না। বসে বসে এখানে পড়, যতদিন ইচ্ছা, যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ পড়।’ পঠনের মাঝখানে বিরতি দিয়ে দিয়ে পান করা যাবে চা, যদি মন চায় মধ্যাহ্নে ভোজন কর। পান ও ভোজন ফ্রি।
নিয়মিত ওই লাইব্রেরিতে যেতাম আমরা সমমনা তিন বন্ধু। যেহেতু তিনজনই ছিলাম রাজপথের গণমিছিলে ‘আইউবশাহী নিপাত যাক’ স্লোগান দেওয়ায় পারঙ্গম সেহেতু আমাদের জন্য একটু আলাদা সুযোগ। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট বা শিঙাড়া দেওয়া হতো আমাদের। এরকম সুবিধাভোগী আরও একজন ছিলেন। নাম সুজাউদ্দৌলা মজুমদার, যাঁকে খোন্দকার সাহেব সম্বোধন করতেন ‘মনদার ভাই’ ইনি আবার খোন্দকার আজিজকে ডাকতেন ‘খোনার ভাই’।
কোনো কোনো দিন পাকিস্তানে চলমান রাজনীতির সুগন্ধ-দুর্গন্ধ প্রশ্নে মন্দার-খোনার বিতর্ক খুব উচ্চ রবে উঠে গেলে আমরা দুই ঠোঁটে তর্জনী চেপে ধরে হিসহিস আওয়াজ দিতাম, ‘প্লিজ! রিডারদের ডিস্টার্ব করবেন না।’ তখন তাঁরা কাজিয়া খ্যামা না দিয়ে পাঠকদের নির্বিঘ্ন পঠনের সুবিধার্থে পাশের ছোট্ট একটি কামরায় ঢুকে রুদ্ধদ্বার যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন। এদিকে আমরা সে সময় মজা আহরণের জন্য দেওয়ালে কান পেতে রাখতাম।
রুদ্ধদ্বার তুমুল বাগ্যুদ্ধের পর্যায়ে একদিন শুনি মন্দার বলছেন, ‘খোনার ভাই আপনার মাথায় সব জিনিস কমবেশি আছে। শুধু একটা জিনিস বিলকুল অনুপস্থিত। ওইটা কী জানেন? জানেন না তো! আচ্ছা আমি কয়া দিই। আপনার নাই সাইলেন্টলি দেখে যাওয়ার পেশেন্স। জবাবে খোনার বলেন, ‘হেল্ উইথ ইয়োর পেশেন্স। আপনি প্যাঁচাইয়া-পুঁচাইয়া বুঝাতে চাইতেছেন ডিক্টেটর হলেও বিস্তর সওয়াবের কাজ করেছেন আইউব খান। উনি পাকা পাকা রাস্তা বানাইতে বানাইতে গেরামের কলিজা তক ঢুকায়া দিছেন। আমার দরকার ভাত ডাল মাছ তরকারি। সেগুলোর নাম নাই। উপাস দিতে দিতে কঙ্কাল হয়া গেলাম, পাকা রাস্তা দিয়া হাঁটি ক্যামনে?’
‘ম্যান ক্যান নট লিভ বাই ব্রেড এলোন’ বলেন, সুজাউদ্দৌলা মজুমদার, ‘প্যাট ভইরা ভাত খাওয়ানটাই জীবন না। সার্থক বলা যাবে তাকেই যে জীবনে খাদ্য শিক্ষা বস্ত্রের সহজ স্বাভাবিক প্রাপ্যতার পাশাপাশি দ্রুত ও স্বচ্ছন্দ চলাচলের অবাধ আয়োজন থাকে। নাই নাই নাইরে হাহাকার দিয়ে রিক্ততার জানান দেওয়া আর যা আছে তা আগলে রাখা এক কথা নয়। পরিমিতি বোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে অর্জনের সাধনাকেও বিলাসিতার উদগ্র বাসনা বলে আখ্যায়িত করার প্রবণতা ঔচিত্যের চিহ্ন নয়, বিকারের দুঃখদীর্ণ ছাপচিত্র।’
‘ওরে আল্লাহ রে! আপনি তো দেখি, সব বাদ দিয়া মাওলানা সিরাজী তরিকায় বয়ান দেওয়া শুরু করলেন। আপনার প্যাঁচানো ত্যাড়ানো বাংলার তরজমা করবে কে? জানতে চাইলেন খোন্দকার আবদুল আজিজ। মজুমদারের উত্তর, ‘কমপেয়ার করণের কাজটাও ঠিকমতো করেন না। কোথায় সিরাজী হুজুর আর কোথায় আমি। ওনার নখের যোগ্য যদি হতাম, তাইলে বক্তৃতা দিয়া দিয়া বাঙালি জাতিরে শোষণের বিরুদ্ধে কত্ত আগে ঐক্যবদ্ধ কইরা পাকিস্তানরে ফাটাইয়া দিতাম!’ প্রবল কৌতূহলী হই আমরা। মজুমদার সেই কৌতূহল মিটিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে জানান, ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারতকে স্বাধীন করার জন্য জনমত সংগঠন করছিলেন মাওলানা ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলায়ও এসেছিলেন। সূর্য উঠি উঠি করার সময়টায় তিনি সভামঞ্চে ওঠেন। মাইক ছিল না। বিরাট একটা টেবিল, সেই টেবিলের ওপর আরেকটি ছোট টেবিল। ছোট টেবিলটির ওপর চেয়ার। ওই চেয়ারে দাঁড়িয়ে মহান দেশপ্রেমিক মাওলানা সিরাজী পাঁচ হাজার শ্রোতার উদ্দেশে ভাষণ শুরু করলেন, ‘পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ আমার প্রাণপ্রিয় ভ্রাতাসকল। আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। প্রভাতের মৃদুমন্দ সমীরণ যখন বহমান, যখন রবির কিরণ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান এবং তারই প্রভাবে আমাদের হৃদয়কোণ অব্যক্ত তৃপ্তিতে পূর্ণ হওয়ার উপক্রম, ঠিক সেই মুহূর্তে দু’একটি কথা নিবেদন করবার জন্য এই অধম আপনাদের সামনে দণ্ডায়মান...।’
শ্রোতারা বলল, ‘হুজুর আমরা হাইল্লা চাষা মূর্খ মানুষ। আমরা ইংরাজি বুঝি না। মেহেরবানি কইরা বাংলায় কন হুজুর।’ মহাসমস্যা! বাংলাকে মনে করা হচ্ছে ইংরেজি। সমাধানের উপায়? উপায় হলো তরুণের স্মার্টনেস। কলকাতায় কলেজে পড়ুয়া এক তরুণ মঞ্চে উঠে বক্তার পাশে দাঁড়ান এবং তর্জমা শুরু করেন, ‘হুজুর কইতেছেন- বেইন্নার হির হির বাতাস চইলতেছে, সুইজ্জের আলো এককানা এককানা করি দেখা যাইতেছে, কী চমেৎকার একখান অবস্থা। ঠিক সেই সময় হ্যাতেন দুই একখান কথা কওনের লাই আমনে গো সামনে খাড়াইছেন...।’
লাইব্রেরিতে বই পড়তে আসা যুবকদের সঙ্গে খুব নিচু স্বরে ভাব মতবিনিময় করতেন সুজাউদ্দৌলা মজুমদার। একবার তিনি আমাকে বলেন, ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করার প্রকৃত উপায়গুলোর অন্যতম দেখে যাওয়া। শুধু দেখে যাও। দেখে যাওয়ার মধ্যে কত আনন্দ। কত বেদনা। এই আনন্দবেদনার মধ্যে সুপ্ত হয়ে রয় শক্তি, যে শক্তি আয়ত্ত করতে পারলে তুমি রুখে দিতে পারবে বেদনার উৎসমুখ।’ উপদেশ শোনা সহজ মেনে চলা কঠিন। নীরবে দেখে যাওয়ার চর্চা করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম, ‘পানিতে ডুব দাও, গা কিন্তু ভিজাবে না’র মতো ওটা। দেখতে দেখতে রুষ্ট হই। যা দেখে রুষ্ট হলাম তা বন্ধ করতে পারলাম না। কী যে বেদনা! উল্টোটাও হয়েছে। তর্জনগর্জন আস্ফালনে ধরণীরে নিতে চায় রসাতল, এমন বৈশিষ্ট্যধারীর আকস্মিক চিৎপাত ঘটায় পেয়েছি আনন্দ অপার। কিন্তু মজুমদার কথিত শক্তির দেখা পাচ্ছি না।
দেখে যাওয়াকে অনেকে বিজ্ঞান বলে মানেন। মানার যৌক্তিক কারণ খুঁজতে গিয়ে কয়েকবারই আমার অজ্ঞান দশা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস যখন গণ অভ্যুত্থানের তোড়ে ভেসে যাওয়ার দশায়, সে সময়ও তিনি ‘শেষ দেখে যাওয়া’র বিজ্ঞান অবলম্বন করেন। ‘সাংবিধানিক কর্তৃত্ববাদ’ দর্শনে বিশ্বাসী কিলুসাংকাগং লিপুনান (নতুন সমাজ আন্দোলন) পার্টির নেতা মার্কোসের একুশ বছরের শাসন দুর্নীতি-অপচয়-নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত। (মজার বিষয়- মার্কোসপুত্র বংবং মার্কোস এখন ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট, তিনি ২০২২ সালের ৩০ জুন নির্বাচিত)। রটনা আছে, সপরিবারে হাওয়াই দ্বীপে (যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য) পালিয়ে যাওয়ার আগে তিনি ১০০০ কোটি ডলার পাচার করেছেন। মার্কোস মারাও গেছেন হাওয়াইর রাজধানী হনুলুলু শহরে ১৯৮৯-এর ২৮ সেপ্টেম্বরে। ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর তাঁর লাশ ফিলিপাইনে এনে দাফন করা হয়েছে।
ফার্দিনান্দ মার্কোসের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য স্টিফেন সোলার্জের (জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ : মৃত্যু ২৯ নভেম্বর ২০১০)। শেষ দেখে যাওয়ার জন্য তিনি ভরসা করেন তাঁর এই মার্কিন বন্ধুকে। নিউইয়র্ক থেকে ৯ বার কংগ্রেসম্যান নির্বাচিত হওয়া সোলার্জ তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান। ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রকরাও তাঁকে সমীহ করতেন। দুনিয়ার কোথাও উদ্বেগজনক কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সরেজমিন মূল্যায়নের জন্য রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগানের মার্কিন সরকার ডেমোক্রেটিক দলীয় সোলার্জকে পাঠাত।
১৯৮৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছিলেন নিউ পিপলস আর্মি দলের মনোনীত প্রার্থী কোরাজন একুইনো। কিন্তু জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মার্কোস নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে জনতা। জনগণের শক্তির সঙ্গে ভিড়ে গেলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল ফিদেল রামোস। নাজুক এক অবস্থা! ফোন করলেন মার্কোস, ‘দোস্ত, একটা কিছু কর। ক্লার্ক (নামক জায়গায়) ঘাঁটির মার্কিন সেনারা যেন জলদি এসে রাজধানী ম্যানিলার নিয়ন্ত্রণ নেয়- সেরকম নির্দেশ দিতে তোমাদের প্রেসিডেন্টকে বল।’ ‘ঘাবড়িও না মার্কোস’ অভয় দেন স্টিফেন সোলার্জ, ‘এক ঘণ্টার মধ্যে আমি প্রেসিডেন্ট রিগানের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করছি। তোমার জন্য অবশ্যই ইতিবাচক একটা ফল বের করে আনব।’
চামচা সেনাপ্রধান জেনারেল ভার এবং গুটি কয়েক মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে উদ্বেগকুল মার্কোস অপেক্ষমাণ। প্রতিটি মিনিটকে তাঁর মনে হচ্ছে একেকটি ঘণ্টা। ম্যানিলার রাজপথগুলোয় বাড়ছিল গণজোয়ার। সময় যায় আর যায়। তারপরই ২৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৮৬) দুপুরে ক্রিং ক্রিং ক্রিং ফোন বাজে। অপর প্রান্তে সোলার্জের কণ্ঠ। মার্কোস বলেন, ‘সোলার্জ দোস্ত আমার। বলো কী করলে।’ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে। সোলার্জ বলেন, ‘তোমার জন্য সুখবর। প্রেসিডেন্ট রিগান হেলিকপ্টারে তোমাকে ক্লার্ক ঘাঁটিতে নিয়ে আসার অর্ডার দিয়েছেন। ক্লার্ক থেকে উড়াল দিয়ে তুমি সোজা চলে যাবে হনুলুলু। কার সাধ্য তোমায় স্পর্শ করে!’
সুদর্শন, সুবক্তা ও সুরসিক স্টিফেন সোলার্জের ভিন দেশে ‘প্রকৃত অবস্থা দর্শন’কে ঘিরে সত্যমিথ্যা গল্প প্রচারিত আছে। তাঁর ভারত-পাকিস্তান সফরকেন্দ্রিক সরস ঘটনাটিকে তিনি ‘পুরোটাই ফাজিলদের কারখানায় তৈরি’ বলে অভিহিত করেন। তবু জল্পনা থামে না। কেননা সত্যতা অস্বীকার করার সময় সোলার্জ ছিলেন হাস্যমুখ। গল্পে আছে, ওয়াশিংটনের সাংবাদিকরা সোলার্জের কাছে জানতে চান ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থা কেমন দেখলেন। সোলার্জ জানান, ভারত-পাকিস্তান অভিন্ন সীমান্ত পরিদর্শনকালে তিনি দেখেন পাকিস্তানের একটি কুকুর ভারতে ঢুকছে আর ভারতের একটি কুকুর পাকিস্তানে ঢুকছে। তারা মুখোমুখি হয়ে সালাম বিনিময় করে।
পাকিস্তানি কুকুরের প্রশ্ন, ‘আপনি কোন দুঃখে দেশ ছাড়ছেন। ভারতীয় কুকুর বলে, যে খাবার দেয় তাতে পেট ভরে না। তবে ঘেউ ঘেউ করতে কোনো বাধা নেই। শুধু ঘেউ ঘেউতে কী পেট চলে? তো ভাই আপনি কেন দেশ ছাড়ছেন। আপনাকে কী ভরপেট খেতে দেয় না।’ পাকিস্তানি বলে, ‘তা অবশ্য দেয়। কিন্তু ঘেউ ঘেউ করতে দেয় না। কে তাদের বোঝাবে (পাকিস্তানে চলছিল জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসন) যে ডগস ক্যান নট লিভ উইদাউট বার্কিং!’
লেখক : সাংবাদিক