বছর দুই আগের কথা। এক তরুণের খবর পেলাম। সেই তরুণের জীবনে রয়েছে মজার এক গল্প। মৌমাছিকে ঘিরে সে রচনা করেছে অ্যাডভেঞ্চারে ভরা যাযাবর এক জীবন। তরুণের নাম মুয়াজ্জিন হোসেন। বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে।
শীতের এক ভোরে রওনা হয়েছিলাম মুয়াজ্জিন হোসেনের কর্মকাণ্ড দেখতে। কুয়াশাঢাকা প্রান্তর। গ্রামগুলো শীতের আড়মোড়া ভেঙে তখন জাগতে শুরু করেছে। সিঙ্গাইরের জার্মিতা ইউনিয়নের কাঞ্চননগর গ্রামের মাঠে পৌঁছতে সকালের মিষ্টি রোদ উঁকি দিচ্ছিল। আদিগন্ত হলুদ শর্ষের মাঠে রোদ্রের ঝিলিক ফুলের ওপর বিন্দু বিন্দু শিশির মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করে উঠছে।
শর্ষের মাঠের এক কোণে একটা তাঁবু টানানো। আর তাঁবুর কাছাকাছি অনেক মৌমাছির বাক্স। তাঁবুর কাছাকাছি সকালের মধুভাঙার কাজ করছিলেন মুয়াজ্জিন। হালকা গড়নের তরুণ। বয়স ৩০ অতিক্রম করেছে বলে মনে হয়নি। আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।
বলছিলাম মুয়াজ্জিন হোসেনের জীবনের মজার গল্পের কথা। এ তরুণ একটু পাগলাটে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ করা। স্বভাতই এ বয়সের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি কিংবা করপোরেট অফিসে কাজকর্ম করার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু মুয়াজ্জিনের স্বপ্নটাই ভিন্ন রকম। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমবিএ পড়ার সময় ইউটিউবে আপনার একটা ভিডিও দেখলাম মৌমাছির চাষ নিয়ে। দেখে খুব আগ্রহ হলো। মৌমাছি চাষ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। বাসায় জানালাম, আমি মৌমাছি চাষ করতে চাই। বাবা শুনে রেগে গেলেন। পড়াশোনা করে শেষে মৌচাষি! একদিন বাসা থেকে পালিয়ে গেলাম। বাগেরহাটে এক মৌচাষির কাছে গিয়ে বললাম, আপনার সঙ্গে থেকে কাজ করে আমি মৌচাষ শিখতে চাই। তিনি রাজি হলেন। বললেন, মাইনেটাইনে কিছু দিতে পারবেন না। পেটেভাতে কাজ করতে চাইলে তাঁর সঙ্গে থাকতে পারি। আমি তাতেই খুশি। তাঁর সঙ্গে দুই মাস থেকে কাজ শিখলাম। একদিন মৌমাছির কামড় খেয়ে চেহারা পাল্টে গিয়েছিল। দশ-বারো দিন বাসা থেকে বের হতে পারিনি। তারপরও আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করে গেছি। তৃতীয় মাসে তিনি জানালেন আমার শেখা কমপ্লিট। তিনি আমাকে চারটি বাক্স উপহার দিলেন। বললেন, ‘মাইনেটাইনে তো কিছু দিই নাই। এইটা তোমার জন্য উপহার। সেই চারটা বাক্স দিয়ে শুরু। এখন আমার ৬৪টা বাক্স।’ মুয়াজ্জিনের কাছে মৌ পালনের এ কাজগুলো যতটা না বাণিজ্যিক আকর্ষণ তার চেয়ে বেশি আকর্ষণ করে মৌমাছির জীবনচক্রের প্রতিটি অংশের পাঠ। গত ছয়-সাত বছরে এ তরুণ অসাধারণ কিছু বিষয় তাঁর ধারণায় আনতে পেরেছেন। ফুলে ফুলে মৌমাছির মধু আহরণ, উড়ে উড়ে বাক্সে মধু পৌঁছানো থেকে মৌমাছিদের জীবনচক্রের এক গভীর দর্শক তিনি। ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছিকে কিছুটা নিস্তেজ করে বাক্সে রেখে কাঠের ফ্রেম থেকে মধু আহরণ করতে করতে বলছিলেন নানান অভিজ্ঞতার কথা। ‘মৌমাছি কখনো নষ্ট ফুল থেকে মধু আহরণ করে না।’ বলছিলেন মুয়াজ্জিন। ‘মৌমাছি মূলত পরিষ্কার ও অব্যবহৃত ফুল থেকেই মধুর উপাদান সংগ্রহ করে। আধা কেজি মধুর জন্য ৬০০ মৌমাছিকে প্রায় ২০ লাখ ফুলে ভ্রমণ করতে হয়। একটি কর্মী মৌমাছিকে প্রায় ১৪.৫ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। যা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করা সম্ভব।’
মুয়াজ্জিন শুধু মধু উৎপাদনের এ সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাটি দেখেই অভিভূত নন, প্রকৃতির এমন চমৎকার চেইন অব কমান্ড যে মানুষের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে, তা-ও উপলব্ধি করেন। প্রতিটি মৌবাক্স মূলত একেকটি কলোনি। প্রতিটি কলোনিতে চলছে নির্দিষ্ট এক শাসনব্যবস্থা। সেখানেও রয়েছে ক্ষমতার পালাবদল। রয়েছে কলোনির সবচেয়ে প্রভাবশালী রানি মৌমাছির সুরক্ষা ও অবিরাম সেবাযত্নের প্রাকৃতিক নজির। এত গভীরে হয়তো কখনোই আমাদের দৃষ্টি পৌঁছে না।
মুয়াজ্জিন যখন মৌমাছি দেখিয়ে বর্ণনা করছিলেন আমার কানে ভাসছিল সালমান হুজুরের বয়ান। আমাদের খিলগাঁও মসজিদের ইমাম ও খতিব সালমান হুজুর। তরুণ এ খতিব আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ইসলাম, সমাজ ও জীবনের নানান বিষয়ে তিনি চমৎকার বয়ান করেন। তাঁর বলার ধরন এত সুন্দর ও সাবলীল যে শুনতে ভালো লাগে। একদিন তিনি সুরা আল নাহল থেকে বলছিলেন। কোরআনের আয়াত বাংলায় অনুবাদ করে ব্যাখ্যা করে দিচ্ছিলেন। ‘নাহল অর্থ মৌমাছি। সুরা আল নাহলের ৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- এরপর প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু খাও, অতঃপর তোমার রবের সহজ পথ অনুসরণ কর। তার পেট থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়; যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয় এতে রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন।’ এরপর তিনি এর তাফসির বলেন, ব্যাখ্যা করেন মৌমাছির জীবন ও কর্মপদ্ধতি। তিনি বলছিলেন, মৌমাছির মাথায় দুটি অ্যান্টেনা আছে, এ অ্যান্টেনা দিয়ে রানি মৌমাছির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে। মধুতে যেমন আরোগ্য আছে, তেমনি মৌমাছির জীবনধারা থেকে মানুষের জন্য রয়েছে অনুসরণীয় অনুষঙ্গ। তন্ময় হয়ে শুনছিলাম সালমান হুজুরের কথা। গত চার দশকে মৌমাছি চাষ নিয়ে বহু প্রতিবেদন তৈরি করেছি। মৌমাছিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু এত গভীরভাবে ভেবে কখনো দেখিনি। দেখেছি মৌমাছি চাষে বাণিজ্যিক লাভের কথা চিন্তা করেই। মুয়াজ্জিন একটা বাক্সে শত শত মৌমাছির মধ্য দিয়ে একটি রানি মৌমাছির বিচরণ দেখালেন। দেখলাম কর্মী মৌমাছি কী সুন্দরভাবে রানিকে জায়গা করে দিচ্ছে। ঘর দেখে দেখে রানি মৌমাছি ডিম ছাড়ছে। কর্মী মৌমাছিরা যত্ন নিচ্ছে। এক দারুণ জীবনব্যবস্থা। যেন তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে সুষ্ঠু সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র সবই। মুয়াজ্জিন মধু আহরণের পাশাপাশি রানি মৌমাছি আর শ্রমিক মৌমাছির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কটি বোঝাপড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি কলোনিতে অবস্থানরত মৌমাছির মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি ও গোত্র। এসব ভেদাভেদে প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা আলাদা দায়িত্ব ও কর্তব্য। সভ্যতার এই এক অদ্ভুত নিদর্শন। সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতিতে মানুষের কল্যাণে নানান উপাদান দিয়ে রেখেছেন, আমাদের উচিত এগুলো সম্পর্কে জানা-বোঝার চেষ্টা করা। মুয়াজ্জিন বলছিলেন, মৌমাছির জীবনচক্রের ভিতর দিয়ে নিজের জীবনকে অন্বেষণ আর মধু থেকে আয় করা জীবিকায় তাঁর মধুর জীবন। এ নিয়ে বেশ ভালো আছেন। জীবনকে উপভোগ করছেন।
আমার জানামতে, সারা দেশে মধু সংগ্রহের পেশায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার মৌয়াল বা মধুচাষি। যাঁদের হাতে পাল্টে গেছে মধু আহরণের হাজার বছরের পুরোনো ধ্যানধারণা। মধু চাষ বা আহরণ এখন একটি শিল্প। সাধারণত কালিজিরা, ধনিয়া, লিচু ও শর্ষে ফুল থেকে মধু উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে শর্ষে ফুলের মধু সংগ্রহের ব্যাপারটিই বেশি দৃশ্যমান। এ ছাড়াও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনকেন্দ্রিক সারা বছরই মধু আহরণ হয়ে থাকে। দিনে দিনে দেশে মধু আহরণের পরিমাণ বাড়ছে। খবরে জেনেছি, বর্তমানে বাংলাদেশে মধুর বার্ষিক বাজারমূল্য আনুমানিক ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে প্রাকৃতিক ও চাষ থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছে ২০-২৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে অবশ্য চাষের মধু ৯০-৯৫ ভাগ। বাকিটা প্রাকৃতিক। এখন অনেকেই মধু বিদেশেও রপ্তানি করছেন। গত কয়েক বছরে দেশের অনেক শিক্ষিত তরুণ বা উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষে নেমেছেন।
মৌচাষের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ, বাজার তৈরি, মৌচাষিদের ঋণ নিশ্চিত করাসহ নানা বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর প্রতিবেদন তুলে ধরেছি। এর সুফল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ নীতিমালায় মৌচাষ অন্তর্র্ভুক্ত হয়েছে। অনেক আশা-নিরাশার পথ পেরিয়ে মৌচাষিরা এখন সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
আমাদের দেশি মধুর চাহিদা ও বাজার বাড়ছে। দেশি মধুর মান ও বৈশিষ্ট্যগুলোও মানুষ মূল্যায়ন করতে শিখছে। বিষয়গুলো ইতিবাচক। আরও ইতিবাচক বিষয় হলো, মুয়াজ্জিনের মতো শিক্ষিত সচেতন তরুণ উদ্যোক্তারা মৌচাষে আসছেন। আমি বিশ্বাস করি উদ্যমী এ তরুণদের অনুসন্ধানী মন, আত্মবিশ্বাস ও আন্তরিকতায় মৌচাষশিল্প বহু দূর এগিয়ে যাবে।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব