নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ ১৭২২ সালে সমগ্র বাংলাকে ২৫টি জমিদারিতে বিভক্ত করেছিলেন। রাজশাহী জমিদারি ছিল এগুলোর অন্যতম। রাজশাহী জমিদারির সদর দপ্তর ছিল নাটোর শহরে। কোম্পানি ১৭৮৬ সালে কয়েকটি জমিদারি অঞ্চলকে জেলা সৃষ্টি করে কালেক্টরেট গঠন করে। এর সূত্র ধরে রাজশাহী জেলা হয়ে ওঠে। এরও কয়েক শ বছর আগে থেকে বর্তমান রাজশাহীসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে রেশমশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল।
রেশমশিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে রেশমজাত পণ্যের প্রধান ক্রেতা হয়ে ওঠেন ইউরোপের ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ ও আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরা। ওই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা বাংলার বিভিন্ন এলাকায় উৎপন্ন, বিশেষ করে তৎকালীন রাজশাহীর অসংখ্য স্থানে প্রস্তুতকৃত রেশমি সুতা ও বস্ত্র সংগ্রহ করে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন। এদের মাধ্যমে এই পণ্যের নামকরণ হয়েছিল বেঙ্গল সিল্ক।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, রহনপুর থানাগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। স্বাভাবিকভাবে রাজশাহী জেলার সিল্কের প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসা রেশম ঐতিহ্য বহনকারী থানাগুলো। রাজশাহী জেলা প্রাচীনকাল থেকেই রেশম ও রেশমজাত পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিতে অবিভক্ত ভারতবর্ষের যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করে এসেছে। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হান্টার বলেন, ‘রাজশাহী জেলায় রেশম সুতা প্রস্তুত এবং রেশম বস্ত্র বয়ন বহু শতাব্দী আগে থেকেই হয়ে আসছে।’ মুঘল আমল থেকেই শিল্পটি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এগিয়ে যায়। রাজশাহীর বোয়ালিয়া বন্দরকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে তুঁতের চাষ হতো। গঙ্গা (পদ্মা) তীরবর্তী বোয়ালিয়ায় ওলন্দাজদের বাণিজ্যিক কুঠিটি তৈরি হয়েছিল মূলত রেশমের কারবারের জন্যই। এটি ছিল এই শহরের প্রথম বড় পাকা স্থাপনা। সম্ভবত আঠারো শতকের প্রথম দিকে এটি স্থাপিত হয়। পলাশী যুদ্ধের পরে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক কুঠিটির দখল পেয়েছিল। ওলন্দাজরা গঙ্গা তীরবর্তী রাজশাহী জেলার সারদাতে ১৭৮০ থেকে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফ্যাক্টরিসহ বৃহদাকারের বাণিজ্যিক কুঠি নির্মাণ করে রেশমের পাশাপাশি নীলের ব্যবসা শুরু করে। ১৮২৫ সালে ডাচদের (ওলন্দাজ) কাছ থেকে সারদার ফ্যাক্টরি এবং কুঠি ইংরেজ ব্যবসায়ীরা চুক্তির ভিত্তিতে পেয়ে রেশম ও নীলের কারবার শুরু করে। রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানি এ সময়ে রাজশাহীতে প্রায় একচেটিয়া রেশম ও নীলের ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। এই কোম্পানির আওতাধীন বৃহত্তর রাজশাহীসহ কাছাকাছি অঞ্চলে ১৫২টি রেশম ও নীলকুঠি ছিল। রেশমকুঠিগুলো ছিল পদ্মা, বড়াল, নারদ, হোজা, মুসাখান, আত্রাই, ইছামতী, বারাহী, বারনই এসব নদনদীর তীরে। ওলন্দাজদের পরে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীরা রাজশাহীতে প্রথম দিকে কোনো বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করেনি। তবে একটি কারখানা স্থাপন করে দেশীয় রেশমের সুতা প্রস্তুত, ক্রয় ইত্যাদির কারবার শুরু করে। ওলন্দাজ ও ডাচদের পরে ইংরেজরা রাজশাহীতে এসে রেশম ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে।
মেসার্স ওয়াটসন কোম্পানির পরে নানা হাত বদল হয়ে সবশেষে বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানি রাজশাহীতে বড় কুঠিকে কেন্দ্র করে রেশমের ব্যবসা পরিচালনা করে। এর পাশাপাশি দুটি ফরাসি কোম্পানি মেসার্স এন্ডারসন ও মেসার্স লুই পেইন অ্যান্ড কোম্পানি রাজশাহীতে রেশমের কারবার পরিচালনা করে। ১৮৮৮ সালে ওই তিন কোম্পানির রাজশাহীতে মোট ১৪টি কারখানায় উৎপাদিত রেশমি সুতার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫২ পাউন্ড। বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানির ছিল ১০টি বাণিজ্যিক কুঠি। পক্ষান্তরে মেসার্স লুই পেইন অ্যান্ড কোম্পানির ছিল তিনটি বাণিজ্যিক কুঠি। এগুলো হলো কাজলা, খোজাপুর ও সাহেবগঞ্জে। পরবর্তী সময়ে খোজাপুর ও সাহেবগঞ্জের কুঠি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মেসার্স এন্ডারসন কোম্পানির একমাত্র কুঠিটি শিরইলে ছিল, যার চিহ্ন এখনো গেছে।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বোয়ালিয়া শহর ও আশপাশের এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট দেশীয় কোম্পানি গঠন করে কুঠি ও আড়ত স্থাপন করে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে রেশম সুতা ও রেশমজাত পণ্যের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে মূলত বেসরকারি উদ্যোগে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশমশিল্প।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী