বর্তমানে দেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ২০ লাখ টনের ওপরে। এর মধ্যে মাত্র দুই লাখ টন পূরণ হয় আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। বাকিটা পূরণ করা হয় পাম ও সয়াবিন তেল আমদানির মাধ্যমে। প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ টন ভোজ্য তেল আমদানি করতে খরচ হয় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে কয়েক বছর ধরেই দেশে বিভিন্ন তেলবীজের চাষ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কৃষক পর্যায়েও সরিষা এবং সূর্যমুখী চাষের প্রবণতা বেড়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় তা নিতান্তই কম। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ এম তারিক হোসেন আমাকে একদিন ফোন দিয়ে জানালেন তিনি আমাদের দেশে অপ্রচলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় এক তৈলবীজ ফসল নিয়ে গবেষণা করছেন। যার নাম পেরিলা।
অধ্যাপক তারিকের কাছ থেকে পেরিলার কথা শুনে অনলাইনে সার্চ দিয়ে জানতে পারলাম, পেরিলা মূলত একটি ভেষজ উদ্ভিদ। কোরিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। পেরিলা গাছের পাতা তাদের বিভিন্ন খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি পেরিলার বীজ থেকে পাওয়া যায় স্বাস্থ্যকর তেল। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার রন্ধনশালায় পেরিলা তেলের ব্যবহার উল্লেখ করার মতো। অধ্যাপক ড. এইচ এম তারিক হোসেন ২০০৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চ শিক্ষা অর্জনে গিয়ে পেরিলা বিষয়ে আগ্রহী হন। ২০০৭ সালে দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশে পেরিলার চাষ উপযোগিতা নিয়ে কাজ শুরু করেন। গত নভেম্বরের এক সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পেরিলার গবেষণা প্লটে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম অধ্যাপক তারিকের সঙ্গে। তিনি জানান, পেরিলায় আছে ৫০ থেকে ৫৫ ভাগ লিনোলিনিক অ্যাসিড যা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রধান উৎস, যা হার্টের জন্য খুবই উপকারী। এই বীজ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ তেল আহরণ করা যায়। প্রাপ্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের ৯১ শতাংশ অসম্পৃক্ত যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া মস্তিষ্ক ও ত্বকের জন্যও উপকারী। এ তেলে প্রাপ্ত আমিষের পরিমাণ ২৫ শতাংশ। পানি জমে থাকে না এমন উঁচু জমিতে খরিপ-২ মৌসুমে এ ফসলের চাষ করা হয়। ১৫ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মাঝে বীজ বপন করে প্রয়োজনীয় চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ টন ফলন পাওয়া যায়। এ ফসলে রোগের পরিমাণ অন্যান্য তেল ফসলের চেয়ে কম হওয়ায় অন্তর্র্বর্তী পরিচর্যার খরচও কম। গবেষণা প্লটে পেরিলার চাষ দেখাতে দেখাতে অধ্যাপক ড. তারিক হোসেন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রায় চার টন বীজ উৎপাদনের কাজ করছে। সাউ পেরিলা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে এ বীজ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকের মাঝে দেওয়া হবে। এ ছাড়াও ২০২১ সাল থেকে দেশের অধিকাংশ জেলায় সাউ পেরিলার চাষ হয়ে আসছে।
ড. তারিক বলছেন খরিপ-২ মৌসুমে অর্থাৎ মধ্য জুলাই থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পেরিলা চাষের মাধ্যমে কৃষক তার নির্ধারিত ফসলের বাইরে তেলবীজ উৎপাদন করে লাভবান হতে পারে। এর ফলে স্বাস্থ্যকর ভোজ্য তেলের চাহিদারও কিছুটা পূরণ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গবেষণা প্লটে পেরিলার চাষ এক নতুন সম্ভাবনার কথাই জানান দিচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এই তেলের ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পেরিলা নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি গবেষণা শেষ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল কাইয়ুম মজুমদার। তাঁর সঙ্গেও কথা হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী এই ফসল সমতলের মতো পাহাড়ি অঞ্চলেও চাষ উপযোগী। যারা মাল্টা, লেবু, আমের বাগান করছেন, তারাও একই বাগানে ফসলটি চাষ করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্লটে তুলার সাথি ফসল হিসেবে পেরিলার চাষ সম্ভাব্যতা সম্পর্কে জানলাম।

মাঠেই নিজের উৎপাদিত পেরিলা তেল নিয়ে উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুরের তরুণ উদ্যমী কৃষক সৈয়দ রোকনুজ্জামান। তিনি পেরিলা তেল নিয়ে হাজির হলেন। সুন্দর একটা বোতলে সোনালি রঙের তেল। অনলাইনে বিক্রির জন্য তিনি এমন প্যাকেজ করেছেন। আব্দুল কাইয়ুম মজুমদারের পরামর্শ নিয়ে পেরিলা চাষ করছেন। কাইয়ুম সাহেব জানালেন, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় বীজ বোর্ড সাউথ কোরিয়ান ভ্যারাইটির সাউ পেরিলা-১ বা ‘গোল্ডেন পেরিলা বিডি’ নামে জাতটির নিবন্ধন দেয় এবং স্থানীয় কৃষকদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। জাতটি অবমুক্তির পর ২০২০ সালেই ১৪টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক চাষ হয়। উৎপাদন ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে পেরিলার চাষ শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠ থেকে পেরিলা হার্ভেস্ট করা দেখলাম। কীভাবে পেরিলা বীজ থেকে তেল উৎপাদন হয় সেটিও দেখা হলো। অধ্যাপক তারিক জানালেন, সরিষা বীজের মতোই ঘানিতেও ভাঙানো যায় পেরিলা। আবার মেশিনেও তেলবীজ থেকে তেল পাওয়া যায়। চীনের কৃষি যন্ত্রপাতি মেলায় প্রচুর ক্ষুদ্র মেশিন দেখেছি তেল ভাঙানোর। ব্লেন্ডারের মতো ছোট একেবারে ঘরে ব্যবহার উপযোগী তেল ভাঙানোর মেশিনও চীনারা আবিষ্কার করেছে। অধ্যাপক তারিক চীনা একটি মেশিন দিয়েই বীজ থেকে তেল আহরণ করলেন। তিনি বললেন, পেরিলার খৈলেও বেশ পুষ্টি আছে। প্রাণী খাদ্যে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
ল্যাবরেটরিতে বসে কথা হলো এ তেল নিয়ে গবেষণার নানান বিষয় সম্পর্কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠে বিভিন্ন ন্যানো ফার্টিলাইজার ব্যবহার করে যাচাইবাছাই চলছে ফলন বাড়ানোর জন্য। মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কৃষক সৈয়দ রোকনুজ্জামান। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর এলাকায় ১২ একর জমিতে এর চাষ করেছেন তিনি। প্রথমে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় ১০ একর জমি বর্গা নিয়ে পেরিলার চাষ করেছিলেন। প্রথমবার অভিজ্ঞতা কম থাকায় ফলন আশানুরূপ হয়নি। উদ্যমী তরুণ রোকনুজ্জামানের বাড়ি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায়। ২০১২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন কিছুদিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০১৯ সালে এলাকায় ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে অনলাইনে শুরু করেন ফলের ব্যবসা। রোকনুজ্জামান জানান, ২০২০-এ করোনার সময়টাতে ইন্টারনেট থেকে পেরিলার গুণাগুণ ও চাষপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর সাক্ষাৎ করেন পেরিলা গবেষক আব্দুল কাইয়ুম মজুমদারের সঙ্গে। তাঁর পরামর্শেই পরের বছর তেঁতুলিয়ায় পেরিলার চাষ শুরু করেন। অভিজ্ঞতার অভাব ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেবার আশানুরূপ ফলন পাননি। চীন ও কোরিয়ায় পেরিলা বীজ রপ্তানির সুযোগ আছে। কিন্তু তারা যে পরিমাণে চাচ্ছেন সেই পরিমাণে উৎপাদন একা তার পক্ষে সম্ভব নয়। রোকনুজ্জামান জানালেন, ১২ একর জমিতে পেরিলা চাষ করতে তার সব মিলে খরচ হয়ে সাত লাখ টাকার মতো। সব বীজ তিনি বিক্রি করেননি এখনো। ইতোমধ্যে সাড়ে আট লাখ টাকা তার আয় হয়েছে। সময়মতো সব নিয়ম মেনে চাষ করা গেলে পেরিলা থেকে ভালো আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ভোজ্য তেল আমদানিতে আমাদের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, সেই ব্যয় কমিয়ে আনতে দেশে তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সরিষা, সূর্যমুখীর পাশাপাশি পেরিলা চাষের মাধ্যমে কৃষক যদি উপকৃত হয়, তবে পরিকল্পিত উপায়ে এর ফলন বাড়ানো যেতে পারে। তবে কৃষকের মাঠে ব্যাপক আকারে বাণিজ্যিক চাষ শুরুর আগে এর যথাযথ বাজার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিক থেকে পেরিলা তেল কতটুকু নিরাপদ সেটিও যাচাইবাছাই করে দেখতে হবে। আমার প্রত্যাশা সার্বিক দিক বিবেচনাপূর্বক সুপরিকল্পিতভাবে কর্তৃপক্ষ এর চাষ-সম্প্রসারণ নিশ্চিত করবে।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব