বাগেরহাটে দেশের সব থেকে বেশি নারকেল জন্মে। এ জেলার অন্যতম প্রধান অর্থকরী কৃষিপণ্যও এটি। দেশের নারকেলের রাজধানী নামে পরিচিত বাগেরহাটে প্রতিটি বাড়ি বা বাগানে বিপুলসংখ্যক নারকেল গাছ রয়েছে। এর ওপর ভর করে জেলাজুড়ে গড়ে উঠেছিল ১০৯টি অটো কোকোনাট অয়েল মিল। নারকেলের ওপর নির্ভর করে চলত এ জেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের জীবনজীবিকা। এখন নারকেল উৎপাদনে ধস নামায় এসব মানুষের অধিকাংশ পড়েছে সংকটে। ২০১৯ সাল থেকে হোয়াইট ফ্লাই (সাদা মাছি)-এর আক্রমণে মরে যাচ্ছে একের পর এক নারকেল গাছ। ফলন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। কৃষক, কৃষি বিভাগ ও কোকোনাট অয়েল মিল মালিক সমিতি এসব তথ্য জানিয়েছে। জেলা সদর, কচুয়া, ফকিরহাট, চিতলমারী, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও রামপাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নারকেল গাছের পাতার ওপর কালো আবরণ পড়েছে। পাতার নিচে রয়েছে তুলার মতো সাদা রঙের পোকা। যাকে বলা হয় হোয়াইট ফ্লাই বা সাদা মাছি। এ পোকা প্রথমে পাতায় বসে মাকড়সার জালের মতো আবরণ তৈরি করে। প্রতিদিন এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে পাতা নষ্ট হয়ে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফল দেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে। দীর্ঘ সময় এ পোকার আক্রমণে একসময় গাছ মারা যায়।
বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের নাটইখালী গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান, ‘সাদা পোকার কারণে নারকেল গাছের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। গাছ মরে যাচ্ছে। গ্রামের সবার গাছে একই অবস্থা। কৃষি বিভাগকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।’ কচুয়া উপজেলার মঘিয়া গ্রামের কৃষক মাহফুজুল করিম জানান, তাঁর বাড়ি ও খামারে শতাধিক নারকেল গাছ রয়েছে। আগে বছরে এসব গাছ থেকে লক্ষাধিক টাকার নারকেল বিক্রি হতো। এখন বছরে ৫ হাজার টাকারও নারকেল হচ্ছে না। একসময় নারকেল বিক্রি করে সংসার চলে যেত। বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী এসে নারকেল কিনে নিয়ে যেতেন। এখন তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। শরণখোলার রায়েন্দা এলাকার ফাহিমা আক্তার জানান, তাঁদের বাড়ি ও বাগান ভিটায় ৮০টি নারকেল গাছ রয়েছে। পোকার কারণে নারকেল উৎপাদন কমে যাওয়ায় বছরে এখন ৩ হাজার টাকার বেশি লাভ হচ্ছে না। কৃষি সম্প্র্রসারণ বিভাগ জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাগেরহাটে ৩ হাজার ৬৫৪ হেক্টর বাগানে মাত্র ৩৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদন হয়েছে।
জেলা কোকোনাট অয়েল মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. শেখ জবেদ আলী জানান, একসময় এ জেলায় লক্ষাধিক মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদন হতো। এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল ১০৯টি অটো কোকোনাট অয়েল মিল। হোয়াইট ফ্লাইয়ের আক্রমণ শুরুর পর থেকে নারকেল উৎপাদনে ধস চলছে। কাক্সিক্ষত উৎপাদন না হওয়া ও প্রতি পিস শুকনা নারকেলের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকায় হওয়ায় এক এক করে ৯৯টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। জেলায় এখন মাত্র ১০টি কোকোনাট অয়েল মিল ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
বাগেরহাটের সর্ববৃহৎ গ্রান্ড অটো কোকোনাট অয়েল মিলের মালিক স্বপন কুমার বসু জানান, যা-ও উৎপাদন হচ্ছে তার ৯০ শতাংশই কৃষক ডাব হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছেন। অবশিষ্ট শুকনো বা ঝুনা নারকেল প্রতি পিস গড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার ওপরে। ১০টি কোকোনাট অয়েল মিল ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এসব মিলও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে নারকেলসংকটের কারণে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভারত থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শঙ্কর কুমার মজুমদার বলেন, ‘নারকেল গাছে হোয়াইট ফ্লাই বা সাদা মাছি ব্যাপক হারে আক্রমণ করেছে। এটি আসলে ২০১৯ সালে শুরু হয়। এর প্রভাবে জেলায় নারকেলের ফলন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় থেকে একদল বিজ্ঞানী সরেজমিনে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমরা কৃষককে ইমিডা ক্লোরোফিড জাতীয় ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি। নারকেল গাছ অনেক লম্বা। এ কারণে ফুট পাম্পের মাধ্যমে স্প্রে করতে হয়। সব গাছে একসঙ্গে করতে হয়। এটি সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা (আইপিএম)-এর মাধ্যমে করা দরকার। কিন্তু এ পোকা দমনে আইপিএমের সঠিক গাইডলাইন এখন পর্যন্ত হয়নি। বিমানের মাধ্যমে ওষুধ ছিটিয়ে পোকা দমন করা সম্ভব হলে আবারও নারকেল উৎপাদনে সোনালি সময় ফিরে আসতে পারে।’