ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেরুয়া মসজিদ। মসজিদটিতে আজও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মসজিদের নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক গল্পের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। সুলতানি ও মোগল আমলের নকশার সমন্বয়ে দেশে মুসলিম স্থাপত্যের যে কয়টি নিদর্শন রয়েছে, তার মধ্যে বগুড়ার খেরুয়া মসজিদ অন্যতম।
জানা যায়, মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ। বগুড়া শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলার গ্রামীণ সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে খন্দকারটোলা গ্রামে এ মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির নির্মাণশৈলী আজও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক ও দশনার্থীদের হৃদয়ে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
সীমানা প্রাচীর ঘেরা এ মসজিদটির ভেতরে প্রবেশদ্বারের সামনেই রয়েছে প্রতিষ্ঠাতার কবর। মির্জা নবাব মুরাদ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় আব্দুস সামাদ ফকির ৯৮৯ হিজরির ২৬ জিলকদ (১৫৮২ খ্রি) ওই স্থানে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বিশিষ্ট মসজিদটির বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য ৫৭ ফুট এবং প্রস্থ ২৪ ফুট। ভেতরের দিকের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট। আর মসজিদের চারদিকের দেয়ালের পুরুত্ব ৬ ফুট। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চারকোনায় ৪টি মিনার ও পূর্ব দেয়ালে ৩টিসহ উত্তর-দক্ষিণে আরও ২টি দরজা রয়েছে। মসজিদের ৩টি মেহরাব রয়েছে। এ ছাড়া ধনুকের মতো বাঁকা কার্নিশের তলায় সারিবদ্ধ খিলান আকৃতির প্যানেলের আছে চমৎকার অলংকরণ।
দেয়ালে কিছু কিছু পোড়া মাটির চিত্র ফলকও ছিল। তবে সংখ্যায় খুবই কম। এ মসজিদ নির্মাণে ইট, চুন ও শুড়কি ছাড়াও বৃহদাকার কৃষ্ণ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের সামনের দেয়ালে দু’টি শিলালিপি ছিল। এর একটি শিলালিপির ভেতরে বহু মূলবান সম্পদ রক্ষিত ছিল, যা পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত হয়। আর অপরটি বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সম্রাট আকবরের আমলে মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এর দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ব্যতিক্রম অনেক চিহ্ন দেখা যায়। ইটের বিন্যাস ও খাড়া প্যানেলের মাধ্যমে নান্দনিক বৈচিত্র্য তৈরি করা হয়েছে। মিনার, গম্বুজ ও ইটের বৈচিত্র্যময় গাঁথুনি এবং ফুল-লতা-পাতার নকশা পুরো মসজিদটিকে দিয়েছে বিশেষ সৌন্দর্য। এ মসজিদটি দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে ছিল। তবে ৯০’র দশকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ও আগের অবস্থায় ফিরে আনে।
শেরপুর পৌরসভার সাদুবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী জানান, ইতিহাস সমৃদ্ধ এ মসজিদটি পরিদর্শনে প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ও দর্শনার্থীসহ স্থাপত্য বিশারদরা আসেন। তবে মাত্র কয়েকশ’ গজ কাঁচা সড়ক ঐতিহাসিক এ মসজিদকে কিছুটা দুর্গম করে রেখেছে। এ অবস্থায় মসজিদটিতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সরাসরি আসার জন্য পাকা সড়ক নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে মসজিদ পরিদর্শনে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের যেমন তৃষ্ণা মেটাবে, তেমনি মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মাঝে আগ্রহ যোগাবে।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশিক খান জানান, মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন খেরুয়া মসজিদ। শিগগরই মসজিদটির সংস্কার কাজ শুরু করা হবে। পর্যায়ক্রমে পুরো মসজিদ সংরক্ষণে সকল কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, খেরুয়া মসজিদটি এ অঞ্চলের মুসলিম আমলের সবচেয়ে প্রাচীন কীর্তি। আরব দেশ থেকে আব্দুস সামাদ ফকির নামে এক ব্যক্তি শেরপুরের এ এলাকায় এসেছিলেন। এলাকাটি ঘনবসতি হওয়ায় তিনি এখানে একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তখন এ অঞ্চলের শাসক জওহর আলী কাকশালের ছেলে মীর্জা মুরাদ খানের সহায়তায় মসজিদটি নির্মাণ হয়।
বিডি প্রতিদিন/এমআই