প্রাকৃতিকভাবেই শস্য ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের নাটোপাড়ার বামনের বিল। বিলের সঙ্গে সংযুক্ত বেগবতি ও ফটকি নদী। কালীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে জামাল ইউনিয়নের নাটোপাড়া থেকে শুরু বামনের বিল। নাটোপাড়া গ্রামটি কালীগঞ্জ উপজেলার পূর্বাঞ্চলের শেষ গ্রাম। এ গ্রামের অপর প্রান্তে রয়েছে মাগুরার শালিখা উপজেলার মশাখালী গ্রাম। এ বিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে ফটকি ও বেগবতি নদীর মিলন। মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পেশারও পরিবর্তন করেন এ বিল পাড়ের মানুষের। বর্ষা মৌসুমে ঝিনাইদহ, মাগুরা ও যশোরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ বিল ভ্রমণে আসেন। এ সময় বিল পাড়ের মানুষ ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ও ট্রলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। পাশাপাশি মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকেন। আবার শুষ্ক মৌসুমে অনেকে জড়িয়ে পড়েন কৃষি কাজে। সরেজমিন দেখা যায় বিলটি শুকিয়ে বিলের পানি ফটকি ও বেগবতি নদীতে গিয়ে জমেছে। নদী দুটিতে পানিও কমে আসছে তাই এখন তারা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত। নদী এবং নদীসংলগ্ন কয়েকটি খালে তারা ভেসাল জাল, বড়শি, ঝাঁকি জাল, পাতা জাল, বাঁশের তৈরি বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন রকমের মাছ শিকার করছেন। এখন তারা মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। কেউ আবার বিলের জমিতে আগাছা পরিষ্কার করে ধান ও অন্যান্য শস্য চাষ করার জন্য জমি উপযোগী করার কাজে ব্যস্ত। নাটোপাড়া গ্রামের চিকিৎসক ফরিদ আহমেদ বলেন, বেগবতি, ফটকি নদীর মোহনা এবং নদীসংলগ্ন বামনের বিলটি তিন দিক দিয়ে সমৃদ্ধ কারণ এখানে বর্ষার সময় মাছ ধরা ও পর্যটকদের নিয়ে বিল ভ্রমণ করে মানুষ আয়-রোজগার করেন। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি কাজ ও নদী, খাল ও বিলে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায়। এবার বৃষ্টি বেশি হওয়ায় মাছের পরিমাণও বেশি। এখন বিল পাড়ের মানুষ মাছ ধরে বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রয় করছেন। বিলটির নাম বামনাইল হলেও ভ্রমণপিপাসুরা এর নাম দিয়েছেন রাতার গুল বা টাঙ্গুয়ার হাওড়।
বর্ষায় বিলের সৌন্দর্য দেখার জন্য মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা খলিল উদ্দিন বলেন, বর্ষায় এ বিলের রূপ থাকে ভিন্ন। চারদিকে থইথই ঢেউহীন পানি। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেমন রূপ বদলায় এ বিলের। তেমনি কাজের ধরনেরও পরিবর্তন হয় বিলপাড়ের বাসিন্দাদের। একেক সময়ে একেক কাজকে পেশা হিসেবে নিয়ে পুরো বছর কর্মব্যস্ত সময় পার করেন তারা। এর ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি বামনের বিল এখন কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অনেকেই বিলের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট পুকুর খনন করেছেন। এসব পুকুরে দেশি মাছের চাষ হচ্ছে। এ থেকে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে বহু মানুষের। অনেকে আবার বিলের উন্মুক্ত জলাশয়ে হাঁস পালন করছেন। বাঁশ-বেতশিল্প ও জাল বোনার মতো পুরনো পেশা আঁকড়ে রেখেছেন অনেকে। জানা যায়, এই বিলের মাটি খুব উর্বর। বিলের টাটকা ঘাস ও ধানের খড়ে খাবারের জোগান হয় গবাদিপশুর। বিল পাড়ের বহু মানুষ গরু ও ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বিকল্প পেশা হিসেবে অনেকে হাঁস-মুরগি পালন করছেন। বিলের উন্মুক্ত জলাশয়েই মিলছে হাঁসের খাবার। বাড়তি খরচ কম হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষায় বিলে মাছ ধরে বাড়তি আয় করেন এখানকার বাসিন্দারা। কালীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাসান সাজ্জাদ বলেন, ‘প্রাকৃতিকভাবে ও চাষের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বামনের বিলকে ব্যবহার করা গেলে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আমি মনে করি। প্রাকৃতিকভাবেই বামনের বিল শস্য ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত।’