১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রথম দিকে প্রশিক্ষণ দিতে অস্ত্র পাইনি। বাঁশ, কাঠ ও ডামি রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তারুণ্যের সেই দিনগুলো এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয়। ’৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। তখন রক্ত গরম। এখন জীবনের জন্য যত মায়া তখন এতটা ছিল না। সব জায়গায় এগিয়ে থাকতাম। আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের আয় বেশি, কিন্তু বরাদ্দ বেশি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। সেনাবাহিনীতে আমাদের একজন আর তাদের ১০ জন সুযোগ পায়। দেশের প্রতি বৈষম্য মানতে পারি না। কুমিল্লা নগরীর ইউসুফ হাইস্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্র রাজনীতি করেছি। আমরা এক ভাই এক বোন। সারা দিন আন্দোলন সংগ্রাম এগুলো নিয়ে থেকেছি। পরিবারকে সময় দিইনি। তখন রাজনীতিবিদ হাবিবুল্লাহ চৌধুরী, সৈয়দ রেজাউর রহমান, অধ্যক্ষ আফজল খান, অধ্যক্ষ আবদুর রউফ, মফিজুর রহমান বাবলু ভাইয়েরা ছিলেন আমাদের সিনিয়র। তাদের সঙ্গে চলতাম। আমাকে মুক্তিযুদ্ধকালীন কুমিল্লার সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ১১ জনের মধ্যে রাখা হয়। ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি শাহ আলম ছিলেন সেই কমিটির আহ্বায়ক। ২৫ মার্চ রাতে আমরা নগরীর মোগলটুলীতে। কেরোসিনের ড্রাম দিয়ে সড়ক ব্যারিকেড দিই। সাম বকশি কাঠের ব্রিজে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিই। ওই সড়কে যেতে সবাইকে বলি গাছ কেটে সড়ক বন্ধ করে দিতে যেন পাকিস্তানি আর্মিরা বাধাপ্রাপ্ত হন। আর ২৭ মার্চ আমরা ভারতের সোনামুড়া চলে যাই। সেখান থেকে ওম্পিনগর ট্রেনিং সেন্টারে যাই। মতিনগর, বক্সনগর, হাতিমারা যুব শিবিরে থেকেছি। ২ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। মেলাঘরে ছিল এর হেডকোয়ার্টার। আমরা ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিলাম। তিনি যোগ করেন, তার টিম বিভিন্ন স্থানে গেরিলা হামলা করত। তারা মারত আর পালিয়ে যেত। এতে পাকিস্তানিরা তটস্থ থাকত।
এটা সত্যি যে, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্বে দিয়েছে। তবে সব দলমতের মানুষ জীবন দিয়েছে। আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে যুদ্ধে যাই। তবে দেশের ক্রান্তিলগ্নে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তার ডাক আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। অথচ তাকে নিয়েও কেউ কেউ বাজে কথা বলেন। কাউকে সম্মান দিলে কেউ ছোট হয় না, বরং বড় হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভিন্নমতের হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বঞ্চিত করা হয়। বিভিন্ন আয়োজনে ডাকা হতো না। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে। তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করতে পারেনি। অনেক এমপি মন্ত্রীরা নিজেদের স্বজনদের ধরে এনে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, শ্রুতিলিখন- মহিউদ্দিন মোল্লা