নেত্রকোনা সরকারি কলেজে পড়ি তখন। আইএ পরীক্ষা দেওয়ার কথা সে বছর কিন্তু দেশে মুক্তিকামী জনতার মিছিলে চলে যাই। ঢাকায় বোনের বাসায় যাই ক্রিকেট খেলা দেখতে। খেলা চলছিল। দুপুর ১২টায় টেলিভিশনে খবর এলো পার্লামেন্ট ভেঙে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে খেলাও ভেঙে যায়।
পরদিন ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলনে গিয়ে শুরু হয় মিছিল মিটিংয়ে যাওয়া আসা। নাখাল পাড়া বোনের বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে যুক্ত হই মিছিলে। রাতের ট্রেনে নেত্রকোনায় ফিরে আসি। ৮ মার্চ মোক্তারপাড়া এনআই খানের বাসায় কয়েকজন মিলিত হই সভায়। ঢাকার খবর নেত্রকোনার খবর পর্যালোচনা করে মোক্তারপাড়া মাঠে সভা করা সিদ্ধান্ত হয়। ১৮ থেকে ১৯ জনের মতো ছিলেন সেই সভায়। শামছুজ্জোহা, আশরাফ আলী খান খসরু, হায়দার জাহান চৌধুরী, আবদুল মান্নান, আবদুল জব্বার, গোলজার আহমেদ, বুলবুল আমেদসহ সবাই একমত হলে ২২ মার্চ পাকিস্তান ডে থেকে বাংলাদেশ ডে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। মোক্তারপাড়া মাঠের দক্ষিণ পূর্বকোণে সভাটি হয়। ২২ মার্চ মোক্তারপাড়া মাঠে কুচকাওয়াজ প্যারেড হয়।
এন আই খান বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এদিকে ২৫ মার্চের কাল রাত্রি আসে। পাকিস্তানি আর্মিরা ঘোষণা দেয় অস্ত্র জমা না দেওয়ার। আবারও মিটিংয়ে বসে সিদ্ধান্ত হয় কোনদিকে দিয়ে কীভাবে কারা অস্ত্র নিয়ে যাবে। এরপর শামছুজ্জোহা ভাই আমাদের চাকু দিয়ে পাঠান। আমি আর বুলবুল ভাই ফার্মের ম্যানেজার ও সিকিউরিটিকে আটকাই। তাদের থেকে একটি রিভলবার, একটি দোনালা, একটি একনালা বন্দুক নিয়ে আসি। একটি টু টু রাইফেলও ছিল। এগুলো আমাদের প্রথম অস্ত্র। এ ছাড়া বাবার রাখা পিস্তলটি নিয়ে যাই ঘর থেকেই। খোঁজ হয় এসডিও অফিসে সরকারি ৪৬৪ থ্রি নট থ্রি রাইফেল আছে। নেত্রকোনায় কোনো সুযোগসুবিধা না পেয়ে ময়মনসিংহে গেলাম।
সেখানে মেজর শফিউল্লাহ ১০টি রাইফেল ও ২০০ রাউন্ড গুলি দিলে আমরা নিয়ে আসি। এগুলো দিয়ে তিনি বলেন, নেত্রকোনার এসডিও কোর্টের অস্ত্রগুলো নিয়ে নিতে। এরপর আমি শামছুজ্জোহা ভাই ও বুলবুল ভাই তিনজন গিয়ে এস ডিপিওকে তুলে নিয়ে আটকে রাখলে তিনি তখন ১৪ হাজার গুলি ও ৪৬৪টি অস্ত্র আমাদের দিতে বাধ্য হন।
যা নিয়ে শুরু হয় মোক্তারপাড়া মাঠে প্রশিক্ষণ। এরপর একদিন উড়োজাহাজ এসে বম্বিং করায় আমরা পালিয়ে যাই। পরবর্তীতে আর্মিরা এসে পড়ায় বাঘমারা প্রশিক্ষণে চলে যাই। ৩৫ দিন প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন এলাকা দিয়ে যুদ্ধ করে করে আটপাড়া এলাকা মুক্ত করে ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোনা মুক্ত হয়। সেদিন আমরা নেত্রকোনা আসি। কিন্তু ওই বছর আর পরীক্ষা দিতে পারিনি। দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধে বেরিয়েছিলাম এদেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে। সুখে শান্তিতে থাকবে মানুষ।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা