পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনে বহুমুখী আতঙ্ক চলছে। বিগত সরকারের সময় ‘ওপরের’ নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে অনেকেই বেকায়দায় পড়েছেন। অনেক কর্মকর্তা অতি উৎসাহী হয়ে কাজ করেছেন। রাতের ভোটে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে বর্তমানে নিজেরা অস্তিত্বসংকটে পড়েছেন। কেউ ওএসডি হচ্ছেন, আবার কাউকে সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাচ্ছে। অনেকেই আগের কাজের জন্য সম্মানসূচক পদবি পেলে সেটিও শাস্তি হিসেবে খেতাববঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ আতঙ্কের বিষয়টি জানা গেছে। মাঠ প্রশাসনসহ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি মুহূর্তে নানা আতঙ্কে থাকছেন তাঁরা। কখন কোন সিদ্ধান্ত আসে। কোন কাজের ভুল ধরে শাস্তির সিদ্ধান্ত হয় সেটি নিয়েও রয়েছে আতঙ্ক। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরপরাধ কর্মকর্তারা সমস্যায় পড়বেন না। তার পরও আতঙ্ক কাটছে না কর্মকর্তাদের। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন নিরীহ কর্মকর্তাও যেন সাজা বা অসম্মানিত না হন সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক রয়েছেন। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের কর্মী এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিতর্কিত নির্বাচনে ভূমিকা রাখার জন্য শুধু ডিসি, এসপি বা বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের ডিআইজিকে শাস্তি দিলে অন্যায় হবে। এখানে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, বিভিন্ন বাহিনীর যারা এ প্রক্রিয়ায় থাকেন সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা উচিত। অন্যদের না এনে বেছে বেছে ডিসি-এসপি শাস্তির আওতায় আনলে সেটি অন্যায় হবে। ভবিষ্যতে নির্বাচনে কেউ যাতে অন্যায় না করেন সেজন্য শাস্তি দরকার। তবে সেটি সবার ক্ষেত্রেই হতে হবে। অন্য যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারা যদি বলেন আমরা রিটার্নিং কর্মকর্তা বা পুলিশের কাছে অসহায় ছিলাম তাহলে এ কর্মকর্তারাও সরকারের কাছে অসহায় ছিলেন। তারা কখনোই সরকারের ওপরে ছিলেন না। এরই মধ্যে শাস্তির আওতায় আসতে শুরু করেছেন ২০১৮ সালে রাতের ভোটের সময় কর্মরত মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ তালিকায় রয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশের ডিআইজি ও পুলিশ সুপার (এসপি)। যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। শাস্তি হিসেবে ইতোমধ্যে সাবেক ৪৩ জন ডিসিকে ওএসডি করা হয়েছে। সূত্র জানান, যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম তাঁদের ওএসডি এবং যাদের চাকরি ২৫ বছরের বেশি তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ২২ জনকে গত বৃহস্পতিবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত ১২ জন সচিব, পাঁচজন গ্রেড-১সহ ২৯ জন অতিরিক্ত সচিব, একজন যুগ্মসচিব এবং একজন উপসচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে।
সূত্রগুলো জানান, অনেকে ওএসডি হয়েও স্বস্তিতে নেই। যাঁরা সার্ভিসে চলমান তাঁরাও নানা আতঙ্কে দিন পার করছেন। অনেকের দুর্নীতির তদন্ত হতে পারে সেটি নিয়েও আতঙ্কে একসময়ের প্রভাবশালী ডিসিরা। বর্তমানে অন্য মন্ত্রণালয় বা গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারাও স্বস্তিতে নেই। এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান বলেছেন, বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য সাবেক ডিসিদের মধ্যে কাউকে ওএসডি ও কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এঁদের মধ্যে যাঁরা অর্থনৈতিক অপরাধ ও দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ তালিকা পাঠানো হবে। ২০১৮সহ ২০২৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারাও অস্বস্তিতে রয়েছেন। সচিবালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, একটা নির্বাচনে কয়েক লাখ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন। অপরাধ কখনো একা না, যোগসাজশে হয়। তাহলে সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। শুধু আমলারাই নন, বাদ যাচ্ছে না পুলিশও। বিতর্কিত নির্বাচনে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৬৪ জেলায় পুলিশ সুপারের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরাও শাস্তির আওতায় আসছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানান, বিতর্কিত নির্বাচনে কারা, কী ধরনের ভূমিকায় ছিলেন, তা খতিয়ে দেখে তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ খবরে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা আতঙ্কে আছেন। ইতোমধ্যেই ২০১৮ সালে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা এক অতিরিক্ত আইজিপিসহ ৮২ পুলিশ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। যাঁদের মধ্যে ১৩ জন ডিআইজি, ৪৯ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও ১৯ জন পুলিশ সুপার পদের কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, বেনজীর আহমেদসহ পুলিশের ১০৩ কর্মকর্তার পুলিশ পদক প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় কর্মক্ষেত্রে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া পদক যখন প্রত্যাহার করা হচ্ছে বিষয়টিকে ‘বিব্রতকর’ উল্লেখ করেছেন অনেকেই।