শিল্পে নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অযৌক্তিক-অবাস্তব একটি সিদ্ধান্ত। এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) আহ্বান জানিয়েছেন শিল্প-কারখানার উদ্যোক্তারা। তারা বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে দেশে নতুন শিল্প-কারখানা তো গড়ে উঠবেই না, বরং চালু কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্প-কারখানা ধ্বংসের চক্রান্ত শুরু হয়েছে বলেও উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেছেন। গতকাল রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে বিইআরসি আয়োজিত শুনানিতে শিল্প-কারখানার মালিকরা এসব কথা বলেন। এদিকে শুনানি চলাকালে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। শুনানিতে উপস্থিত থাকা অংশীজনরা এক পর্যায়ে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে শুনানি বন্ধের দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। হট্টগোলের কারণে তড়িঘড়ি করে মধ্যাহ্ন বিরতির ঘোষণা দেয় বিইআরসি। এর আগে সকালে শুনানি বাতিলের দাবিতে একই ভবনের নিচে মানববন্ধন করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আবদুর রাজ্জাক, সদস্য পেট্রোলিয়াম ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও শুনাতিতে শিল্প-কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, আইনজীবী, ভোক্তা ছাত্র প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। শিল্প-কারখানার গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩০ টাকা এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে (শিল্পে ব্যবহৃত নিজস্ব বিদ্যুৎ) ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা দিতে হয়। নতুন শিল্পের জন্য এটি বাড়িয়ে ৭৫.৭২ টাকা করার প্রস্তাবের ওপর শুনানি গ্রহণ করা হয়। শুনানিতে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে পেট্রোবাংলা বলেছে, প্রতি ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বর্তমান আমদানি মূল্য পড়ছে ৬৫.৭০ টাকা। ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য চার্জ যোগ করলে দাঁড়ায় ৭৫.৭২ টাকা। ফলে এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্যাসের দামের মধ্যে গ্যাপ কমাতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করলে চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হবে প্রায় ১৬ হাজার ১৬১ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, দেশীয় গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ শতাংশের মতো, অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে দেশি গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে এবং এলএনজি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৫ শতাংশে। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বক্তব্যে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব ভয়ংকর গণবিরোধী। এই প্রস্তাবের ওপর কোনো শুনানি হতে পারে না। এটি বন্ধ করতে হবে। এই অযৌক্তিক প্রস্তাব বিইআরসির বিবেচনায় নেওয়া উচিত হয়নি। এই প্রস্তাব আগামী রবিবারের মধ্যে খারিজ করতে হবে। তা না হলে গণ আন্দোলনে নামার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অযৌক্তিক-অবাস্তব, এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে শিল্প। গ্যাসের সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে দেশের পোশাক-গার্মেন্ট শিল্পে এত অগ্রগতি হয়েছে। তিতাসের সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে পারলে দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন হয় না।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) বিসিআইর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ‘ম্যানুফ্যাকচারিং খাত ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি করা যাবে না। আগের সরকার গায়ের জোরে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল, তারপর থেকেই শিল্প খাতে ধস নামতে শুরু করে। গ্যাসের সরবরাহ না পেয়ে প্রত্যেকটি ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ইতোমধ্যে আরএমজি সেক্টরের ২০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এত কিছুর পরও যখন গ্যাসের দাম ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা করা হলে ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে আগে ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেন। এই অবস্থায় যদি নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় তাহলে আমাদের উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এমনিতেই দেশের গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না, সেখানে গ্যাসের মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি করলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের শিল্প, অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান বাঁচাতে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে কীভাবে প্রতি ঘনমিটার ২০ থেকে ২২ টাকায় নামিয়ে আনা যায় সেই উদ্যোগ নিতে হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ৫০০ ডলারের কাঁচামাল ৭০০ ডলারে উঠেছে এবং ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে শিল্প ১ হাজার কোটি টাকায় চালাতে পারতাম এখন প্রয়োজন ১৭০০ কোটি টাকা। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, প্রয়োজন ছিল ১ হাজার টাকা, আছে ৭০০ টাকা, এখন প্রয়োজন হচ্ছে ১৭০০ টাকা, আমরা লসে আছি।’