ভাষা হচ্ছে কতগুলো অর্থবহ ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধ রূপ, যার সাহায্যে একটি বিশেষ সমাজের লোকেরা নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময় করে। যে জনসমষ্টি একধরনের ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধ রূপের দ্বারা নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময় করে ভাষাবিজ্ঞানীরা তাকে একটি ভাষা সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এখানে একটি ধ্বনিসমষ্টির উল্লেখ করা যাক- ‘আমরা বই পড়ি’। এ ধ্বনিসমষ্টি নির্দিষ্টক্রমে বিন্যস্ত করে শুধু বাঙালিরা ব্যবহার করে এবং এর দ্বারা যে ভাব প্রকাশিত হয় তা আমরা বাঙালিদের একটি ভাষা-সম্প্রদায় হিসেবে অভিহিত করতে পারি।
এ ক্ষেত্রে ইংরেজরা যে ধ্বনিসমষ্টি ব্যবহার করবে তা হলো-We read books। জার্মানরা এ ক্ষেত্রে বলবে-Wir lesen Bilcher। ফরাসিরা বলবে- Nous lisons deslivers। সুতরাং দেখা যাচ্ছে একই ধরনের ধ্বনিসমষ্টি দিয়ে সব মানুষের কাজ চলে না। এক এক ধরনের ধ্বনিসমষ্টি ও ধ্বনি সমাবেশবিধিতে এক একটি জনগোষ্ঠী অভ্যস্ত।
ভাষা হচ্ছে, মানুষের এমন এক অনন্য সুলভ বৈশিষ্ট্য, যা অন্য প্রাণী থেকে মানুষকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে, তার স্বাতন্ত্র্যের এ অভিজ্ঞানটি সে পৃথিবীতে তার আবির্ভাবের পর ক্রমবিকাশের ধারায় অর্জন করছে। এ অনন্য সুলভ সম্পদটি শুধু তার আছে, কারণ তার প্রয়োজন আছে এ সম্পদের। তার কারণটি অবশ্য আমরা যদি তলিয়ে দেখি, তবে দেখতে পাব এর মূলে আছে আবার অন্য একটি আরও গভীরতম মানব বৈশিষ্ট্য, যেটি অন্য প্রাণীর নেই। সেটি হচ্ছে মানুষের মন এবং মনের ক্রিয়াজাত তার চিন্তারাজি। বিবর্তনের ধারায় ঝড়ের পরে প্রাণের বিকাশ হওয়ায় বৃক্ষলতা-পশুপাখির আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে। এর পরের ধাপে মনের বিকাশের ফলে মানুষের আবির্ভাব হলো।
মন আছে বলে মানুষ চিন্তাসম্পদের অধিকারী। নিজের ভাব ও চিন্তার সম্পদকে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে চায় বলে তার প্রয়োজন হয় এক উন্নততর প্রকাশমাধ্যম, যার নাম ‘ভাষা’।
শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা বা অন্য জৈববৃত্তি প্রকাশের তাগিদে ভাষার জন্ম হয়নি। জৈব চাহিদাকে অন্যের মনে সঞ্চার করে সমস্যার সহজতর সমাধানে ভাষা আমাদের সহায়তা করে ঠিক কিন্তু পুরোপুরি জৈববৃত্তির তাগিদে ভাষার জন্ম হয়নি।
যদি শুধু জৈব তাগিদে ভাষার জন্ম হতো, তবে জীবজন্তুরা ভাষার জন্ম দিতে পারত অথবা শুধু জৈব প্রয়োজন মেটাতে হলে জীবজন্তুর মতো অস্ফুট ভাষা ও ইঙ্গিত হলে মানুষের কাজ হয়ে যেত। বস্তুর উন্নততর ভাব ও চিন্তাকে প্রকাশের জন্য মানুষের ভাষার প্রয়োজন। এ জন্য চিন্তা ও ভাষার মধ্যে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক রয়েছে। চিন্তার সঙ্গে, মানুষের মনের সঙ্গে তার আত্মার ভাষার এ অপরিহার্য সম্পর্ক আছে বলে জার্মান মনীষী হুমবোল্ট আরও গভীরে গিয়ে বলেছেন, মানুষের ভাষা হলো তার আত্মা, আর আত্মা হলো তার ভাষা।
উক্তিটিতে কবিসুলভ উচ্ছ্বাস আছে স্বীকার করি কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না যে মনীষীর মূল অনুভূতিটি নির্ভুল কারণ ভাষার সঙ্গে মানুষের মন ও তার আত্মার যোগ অবিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ ভাষার উৎস তার মনে, মনের চিন্তারাজির প্রকাশের তাগিদে ভাষার জন্ম। ভাষা হচ্ছে মানুষের চিন্তার ধ্বনিমাধ্যম বিকাশ। ভাষাবিদরা বলেছেন, চিন্তা ও ভাষা মূলত এক, পার্থক্য শুধু এটুকু যে চিন্তা হলো নিজের সঙ্গে নিজের নীরব কথোপকথন এবং যে প্রবাহটি আমাদের চিন্তা থেকে ধ্বনির আশ্রয়ে ওষ্ঠের মধ্য দিয়ে বয়ে আসে তা হলো ভাষা।
ভাষা সৃষ্টির মূলে মানুষের দুটি দিক রয়েছে। ব্যক্তিমানুষের মন ও চিন্তা, সমাজবদ্ধ মানুষের ভাববিনিময়ের ইচ্ছা। অর্থাৎ ভাষার যেমন একটি ভাবগত উৎস আছে, তেমনি একটি সমাজগত চাহিদাও আছে। আধুনিককালে সাহিত্যের যেমন সমাজগত দিকটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তেমনি ভাষার সমাজগত দিক প্রাথমিক তাৎপর্য লাভ করছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা (linguists) তাই প্রথমে মনে করিয়ে দিচ্ছেন- The first point we must make about language, then, is that it is a social, rather than a biological aspect of human life.’ তাই ভাষাবিজ্ঞানীরা আজকাল সমস্বরে বলছেন, ভাষা হচ্ছে একটি সামাজিক সংস্থা- এ কথার তাৎপর্য দ্বিবিধ। প্রথমত ভাষার জন্ম সামাজিক প্রয়োজনে অর্থাৎ সমাজের অন্তর্গত ব্যক্তিদের মধ্যে ভাববিনিময়ের প্রয়োজনে। দ্বিতীয়ত ভাষার প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজের কাঠামো অনুসারে। যে সমাজে শিশুর প্রতি সম্পর্কের আচরণের পার্থক্য আছে, সেখানে তাদের প্রত্যেকের জন্য ভাষার রয়েছে পৃথক নাম-সম্পর্ক চিহ্ন। তা ছাড়া কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক গঠনের পরিবর্তন ঘটছে। ফলে এ সব সম্পর্ক চিহ্নের পরিবর্তন ঘটছে। সামাজিক প্রয়োজনে ও সামাজিক কাঠামো ভাষার প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এসব কারণে আমরা ভাষাকে একটি সামাজিক সংস্থা বলতে পারি।
আমাদের সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শ্বন, বিজ্ঞান, সভ্যতার ক্রমবিকাশের দ্বারা যেমন ক্রমোন্নতি লাভ করবে তেমনি তার নতুন নতুন নান্দনিক উপলব্ধি, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া প্রকাশের জন্য ভাষাকে হতে হবে তত সূক্ষ্ম, উন্নত ও মার্জিত প্রকাশক্ষম।
♦ হলেখক : কলামিস্ট