১৯৭৮ সাল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সার্জেন্ট জহিরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। দু-তিনজন বন্ধু বলাকা সিনেমা হলে জহির রায়হানের কালজয়ী সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখেছিলাম। ছবিতে একটি গান আছে। এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে। দিকে দিকে বাজলো যখন শিকল ভাঙার গান। আমি তখন চোরের মতো হুজুর হুজুর করে রত বাঁচিয়েছি প্রাণ। পরাধীনতার অভিশাপ থেকে জাতির মুক্তির প্রয়াসে সিনেমাটি রচনা করেছিলেন জহির রায়হান। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ এবং রাষ্ট্রের সব সুযোগসুবিধা সমহারে ভোগ করবেন প্রজাতন্ত্রের জনগণ। পাকিস্তান শাসন করতেন বাইশ পরিবার। তাদের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন আমার দেশের সোনার ছেলেরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত বর্তমানে বাংলাদেশের সব সম্পদের মালিক বাইশ শ পরিবার। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কাগজে কলমে স্বাধীনতা পেলেও সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার সুফল থেকে বঞ্চিত। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। সিঙ্গাপুর ছিল একটি জেলেপল্লী। তাদের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, এখনো নেই। তারা পেয়েছিলেন লি কোয়ান উ-এর মতো একজন নেতা। যাঁর নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের বুকে স্বয়ং সম্পূর্ণ জাতি। লি শুধু দুর্নীতি নিরোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করে আধুনিক সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো নেতা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করলেও তিনি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারেননি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে প্রতিটি সরকার দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের অপশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ছাত্র-জনতা গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটান। এখন পর্যন্ত সরকার ঘোষিত গণ অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৫৮ জন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল। এটি কোনো রাজনৈতিক সরকার নয়। কিন্তু কয়েক মাসে তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারা রাজনৈতিক সরকারের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। ইতোমধ্যে তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, যাতে জনমনে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দাউ দাউ করে বেড়ে চলেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে মেধার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে ভর্তিব্যবস্থা আগের মতোই বলবৎ আছে। প্রশাসনে গলাবাজ এবং দুর্নীতিবাজরা পদোন্নতি ছিনিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি কিছু সৎ এবং মেধাবী কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হচ্ছেন। জনগণের টাকায় বেতন-ভাতাদি দিয়ে তাঁদের ভরণপোষণ করা হচ্ছে। কিন্তু জাতি তাঁদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এক দলের লোকদের সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, অপর দলের লোকদের প্রমাণিত অভিযোগ থাকার পরও বিনা বিচারে বেকসুর খালাস দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে জনমনে কানাঘুষা হচ্ছে। এ তো দেখি নতুন বোতলে পুরনো মদ। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, আপনারা এমন কিছু করবেন না, যাতে ভাবীকালে আপনারা বিচারের সম্মুখীন হন।
পাদটীকা : আফ্রিকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার নাম ‘দি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা’। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধান ফটোকে লেখা আছে ‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে এটম বোমা ফেলার দরকার নেই, যদি পারো শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দাও’। দুর্বল শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রকৌশলীরা যে সব ইমারত নির্মাণ করবেন তা ধসে পড়ে মানুষের মৃত্যু হবে। যার প্রমাণ সাভারের রানা প্লাজা। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষায় যে সব লোক চিকিৎসক হবেন তাদের ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যাবেন যা বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটছে। নকল শিক্ষায় যে সব রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মচারী দেশ পরিচালনা করবেন তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হবেন। যার প্রমাণ শেখ হাসিনা সরকারের পতন। অতএব এখনো সময় আছে সাধু সাবধান।
লেখক : কলামিস্ট