বাংলাদেশ দুর্নীতিতে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুর্নীতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ইনডেক্স অনুযায়ী এক নম্বরে ছিল। গত ৫০ বছরে দেশ থেকে ১১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। দেশের একটা শ্রেণি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে দুর্নীতির টাকায়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দল-মতনির্বিশেষে তারা গরিবের হক চুষে খেয়ে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পরোক্ষভাবে বিদেশি প্রভুদের হাতে দেশের অর্থনীতি তুলে দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি প্রলম্বিত করার জন্য, ছাত্র-জনতার ওপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ট্রাক তুলে দেওয়া হয়েছিল। এর জন্য সেলিম, দেলোয়ারের মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাউফুন বসুনিয়া, ডাক্তার মিলন, পাগলা শহীদ, তৎকালীন ছাত্রদলের প্রভাবশালী নেতা সানাউল হক নীরুর সহোদর মাহবুবুল হক বাবলু প্রমুখ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শহীদ হয়েছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক মৃত্যু হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মাধ্যমে। যদিও এই ধারা পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্তরায় হওয়ায় আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বাতিল করে দেওয়া হয়। এই আন্দোলন ছিল একটি স্বৈরাচারকে পতনের মাধ্যমে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ’৯০-থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে, দেশের মানুষ তা ভালো করেই জানে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা নির্বাহে চাহিদা অনেক। দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্যই তাদের প্রাণান্ত সংগ্রাম করতে হয়। বাংলাদেশের মতো ১,৪৮,১৭০ বর্গকিলোমিটারের একটি দেশে প্রায় ১৮ কোটি জনগণ। ফলে ভোগ্যপণ্যের যে বিশাল বাজার রয়েছে, তাকে পুঁজি করে দেশের একটি শ্রেণি বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছে- পরিকল্পিত বাজার সিন্ডিফিকেশনের মাধ্যমে। যার সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের যোগসূত্র সব সময়ই পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে দুর্নীতি একটা বড় সমস্যা। বলা যায় এটাই সব সমস্যার মূল। গত ১৫ বছরে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার যে উন্নয়ন করেছে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল তার মধ্যে অন্যতম। আসলে এসব উন্নয়ন প্রকল্প পুঁজি পাহাড়সম দুর্নীতিই ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের মূল উদ্দেশ্য। তার দলবলের সীমাহীন দুর্নীতি, মুদ্রা পাচার, জনগণের সরকারকে ব্যক্তিগত সরকার বানিয়ে নিজেদের স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিদেশি শক্তির উসকানিতে নিজের দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য এমন কোনো বিতর্কিত কাজ নেই, যা শেখ হাসিনা বা তাঁর দল করেনি। গুম, খুনসহ বিচারবহির্ভূত হত্যা তিনি সজ্ঞানে করিয়েছেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকে শেখ হাসিনার পুরো পরিবার আকণ্ঠ দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। এমনকি তাঁর ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ সরকারের দুর্নীতিবিষয়ক মন্ত্রী হলেও, তাঁর পরিবারের দুর্নীতির আঁচ তাঁর ঘাড়ে পড়েছে। অনৈতিক সুবিধা ও লেনদেনের অভিযোগ মাথায় নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর তাঁর দলের নেতারা হয় বন্দি অথবা পালিয়ে গেছেন বা আত্মগোপনে আছেন, ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে থাকার মতো।
দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই কমবেশি দুর্নীতির ইতিহাস আছে। দুর্নীতি থেকে দূরে থাকার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই নিজের দলকে সংস্কার বা মনোনয়ন বাণিজ্য থেকে সরে আসতে পারেনি। বস্তুত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের কাঠামোতে নানা সমস্যা আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। তাদের নির্বাচনি ব্যয় নির্ভর করে প্রার্থীর সক্ষমতার ওপর। এমন নজির বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে থাকতে পারে না। বিগত ৫৩ বছরে গণতন্ত্রের নামে দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে পেট মোটা অজগরে পরিণত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ বছরে ২০০ বিলিয়নের অধিক পরিমাণ অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বেগমপাড়ায় যারা মুদ্রা পাচার করেছে, তাদের ব্যাপারে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উদ্যোগ খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান এজেন্ডা কী? সংস্কার, নাকি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা? সংস্কারের মধ্যে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ আন্দোলনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য কঠোর অবস্থান নেওয়া হলেও, দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতির, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান শত্রু দুর্নীতিকে দৃঢ়তার সঙ্গে চিহ্নিত এবং নির্মূলের প্রক্রিয়ায় আরও গতি সঞ্চার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গড়ে সাড়ে ৬.৫% প্রবৃদ্ধির ১% চলে যায় নানা অনিয়মে দুর্নীতিবাজদের পকেটে। ১.৫% যায় ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে। ১% খরচ হয় বৈদেশিক ঋণের দেনা পরিশোধে। ২% সরকারি ব্যয়। .০৫% উন্নয়ন। .০৫% সামাজিক ব্যয় বা দারিদ্র্য উন্নয়ন। এটি মোটামুটি একটি হিসাব। সামান্য হেরফের হতেই পারে।
ফলে দুর্নীতির কারণে যে সামাজিক ক্ষতি হয়, বিশেষ করে যে সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়, তার ফলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। বিলাসদ্রব্যের আমদানি বাড়ে, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ডগুলো ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস হয়ে যায়। অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতা বলে- বাংলাদেশে অর্থনীতিতে দুর্নীতিকে উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব না হলেও বেশ শক্ত। সমন্বয়কদের মধ্য থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও তীব্র ও উচ্চকণ্ঠ সামাজিক আন্দোলনের পদক্ষেপ আশা জাতি। জনগণ এই তরুণ তুর্কিদের নিয়ে বড় করে স্বপ্ন দেখে। আশা করে তাদের ইমেজে কোনো কলুষ স্পর্শ করবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং বিদেশি শক্তিকে নানা রকম দেশবিরোধী চুক্তি এবং ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল। পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান পর্বত পরিমাণ উন্নয়নের দাবি করলেও, মূলত দুর্নীতি দুরাচার-দুঃশাসনের কারণে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে অন্তর্র্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেশ স্পষ্ট। যেনতেন প্রকারের সংস্কার করে একটি লোকদেখানো নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়া, হয়তো তারা তাদের জন্য সেভ এক্সিট মনে করতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হবে না।
গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। সামাজিক মানদণ্ডে গণতন্ত্র ছাড়া আর কোনো ভালো সামাজিক মানদণ্ড দৃশ্যমান নয়। ফলে দেশে গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের সাধারণ জনগণ আগামীতে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা সরকারকে স্বাগত জানালেও দুর্নীতি সহ্য করবে না। বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার দুর্নীতি নির্মূলে শতভাগ সফল না হলেও জন-আকাঙ্ক্ষার আগুন ছাইচাপা পড়বে না।
দেশে ভোগ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিরতা, বিনিয়োগে কর্মচাঞ্চল্য, বেকার সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষার উন্নয়ন এসব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গেলে, দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের ছাড় দিয়ে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও ফ্যাসিস্ট তৈরির ফ্যাক্টরি বন্ধ হবে না।
গত ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের বাংলাদেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে জনগণের আস্থা হারিয়েছে। এমনকি বিগত সরকারের ৫৩ জন সচিব মামলার শিকার হয়েছেন। আমলাতন্ত্রের জন্য এ এক লজ্জাজনক গ্লানি। ’৯০-এর গণ আন্দোলনের পর চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ আন্দোলন জাতিকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। জানান দিয়েছে, দুর্নীতি-দুঃশাসনই জাতির বড় শত্রু। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরাচার জনগণের জন্য দানব সমান। তার পতন হয়েছে। এখন অন্তর্বর্তী সরকার সাম্য, সম্প্রীতি, মর্যাদার একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ করছে। রাষ্ট্র সংস্কার চলছে। এই কর্মযজ্ঞ সফল হোক। দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হোক এবং তা শুরু হোক যৌক্তিক দ্রুততায়।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়