আমাদের অর্থনীতির এক প্রাণশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স। প্রবাসে অবস্থানরত লাখ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। যে রেমিট্যান্সের পরতে পরতে রয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ আর দেশের প্রতি ভালোবাসা। নিদারুণ পরিশ্রম আর শ্রমে-ঘামে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের জন্য অতুলনীয় অবদান রেখে চলেছেন। অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিকে একটি শক্তপোক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সন্দেহ নেই এ রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই দেশের রিয়েল হিরো।
জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশের মাটিতে স্বৈরাচারী সরকার যখন একের পর এক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করছিল তখন আমাদের এ অভিবাসী ভাইবোনেরা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পতিত আওয়ামী সরকারের একজন মন্ত্রী অভিবাসীদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেও তারা রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধই রেখেছিলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই দেশপ্রেমিক এ অভিবাসীরাই গত ছয় মাসে দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত তিন বছরের প্রবাসী আয়ের হিসাব করলে দেখা যায় এর গতি ঊর্ধ্বমুখী। ২০২২ সালে প্রবাসী আয় ছিল ২১.২৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ছিল ২১.৯২ বিলিয়ন ডলার। খুবই খুশির সংবাদ, সর্বশেষ গত ২০২৪ সালে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে।
পরিবার-পরিজনকে ফেলে শ্রমে-ঘামে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা। অথচ আমরা দেখেছি, পতিত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে শেখ মুজিব পরিবারের বিরুদ্ধে ৫৯ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। যার সঙ্গে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের যোগসূত্রতা রয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমে টিউলিপ সিদ্দিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় কয়েকদিন আগে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
শুধু শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক নয়, মুজিব পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে। একদিকে প্রবাসী ভাইবোনেরা তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন, অন্যদিকে মুজিব পরিবারসহ হোয়াইট কলার মানুষেরা বিদেশে অর্থ পাচার করছে। যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় কালো দাগ।
দেশের চারদিকে বর্তমানে যে চাকচিক্য দেখা যাচ্ছে, তা অভিবাসীদের রেমিট্যান্সের কল্যাণেই সম্ভব হচ্ছে। তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিশেষভাবে কাজ করছে। এ রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই এ দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির মূল নায়ক। যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা প্রতিকূল পরিবেশে থেকেও অমানবিক পরিশ্রম করে দেশে নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। অভিবাসী শ্রমিকদের প্রবল দেশাত্মবোধ রয়েছে। তারা বিগত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে ফ্যাসিস্ট সরকারের চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পতন নিশ্চিত করেছিলেন। নানা শর্তের বেড়াজালে আইএমএফ ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। অথচ প্রবাসীরা কোনো শর্ত ছাড়াই গত বছর ২৭ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। দেশের কর্মক্ষম ২৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় অভিবাসনের মাধ্যমে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান না করা গেলে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও ১০ শতাংশ বেড়ে যেত।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই প্রবাসীদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে আসছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিক্ষোভ করায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ৫৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড প্রদান করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার। এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে আরও ১৩১ জন আটক হয়েছিলেন। ধন্যবাদ জানাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তাঁর বিশেষ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধান আমাদের এই ১৮৮ জন দেশপ্রেমিক অভিবাসী ভাইকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন। এটি ভবিষ্যতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে।
বর্তমান সরকার কর্র্তৃক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য লাউঞ্জ, সাবসিডাইজ মূল্যে খাবার গ্রহণের সুবিধা, রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া, অভিবাসী কর্মীদের এমআরপি পাসপোর্ট প্রদান শুরু করা, অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের জন্য হাসপাতাল চালু, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রিত রাখার উদ্যোগ নেওয়াসহ অভিবাসী কর্মীবান্ধব বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা অভিবাসী কর্মীদের সম্মানিত করেছে। অভিবাসীদের সম্মনিত করলে, তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করলে, সামাজিকভাবে তাদের স্বীকৃতি প্রদান করলে, দেশের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা, মমত্বশীলতা, দায়বদ্ধতা আরও বাড়বে। ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে তারা আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের লুটপাটের সঙ্গে যেসব মালিক জড়িত ছিলেন সেই ব্যাংকগুলোর ফরেন রেমিট্যান্স হাউস কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত রেমিট্যান্স দেশেই পাঠাত না। ওই বিদেশি অর্থ ব্যাংক মালিকরা তাদের রেমিট্যান্স হাউস থেকে নিজেরাই সেই দেশে রেখে দিতেন। বাংলাদেশে তা প্রেরণ করতেন না। সেই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তিত হওয়ায় এখন আর প্রবাসী কর্মীদের থেকে সংগ্রহকৃত অর্থ তারা সে দেশে রেখে দিতে পারছে না। এটিও রেমিট্যান্স বাড়ার আর একটি কারণ। এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রী, আমলা, ব্যবসায়ীরা লুট করা অর্থ বিদেশে পাচার করতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা বন্ধ হয়ে যাওয়া রেমিট্যান্স বাড়ার আরেকটি প্রধান কারণ।
বর্তমানে সরকার প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থের ওপর ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো আরও ২.৫ শতাংশ বাড়িয়ে অথবা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রণোদনা দিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। বৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রেরণে সরকার ও ব্যাংকগুলোকে আরও আন্তরিক হতে হবে। প্রয়োজনে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মতো ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় কর্মীর কর্মস্থলে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। যদি সম্ভব হয় লেবার রিসিভিং দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিকাশ, রকেট, নগদের মতো কোনো অ্যাপসের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যাতে তারা তাদের পছন্দমতো বিদেশি ওয়ালেটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আমাদের দেশের মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওয়ালেটে তাদের পরিবারের কাছে অ্যাপসের মাধ্যমে সহজেই রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন। অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণে অনলাইন পেমেন্ট সার্ভিস গেটওয়ে করা গেলে প্রবাসী আয় আরও বাড়বে।
তাহলে কর্মীর আত্মীয়স্বজনকে প্রেরিত অর্থ সংগ্রহের জন্য ব্যাংকে গিয়ে ধরনা দিতে হবে না। কারণ হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রবাসে অবস্থানরত কর্মীদের বুকে টেনে নেয়। কর্মস্থল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। আবার কর্মীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ পৌঁছে দেয়। তাই বিদেশে রেমিট্যান্স হাউসগুলোকে তাদের কাজের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি আরও সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসী ভাইবোনদের পাঠানো অর্থের ওপর সরকারি প্রণোদনা ২.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার সুপারিশ করছি। তাহলে কর্মীরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আরও উৎসাহিত হবেন, একই সঙ্গে সম্মানিত বোধ করবেন।
বর্তমানে যেভাবে ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি পাচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে তাতে ব্যবসায়ীরা বলছেন অনেকের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। তাই রেমিট্যান্সের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। কারণ অভিবাসী খাতের জন্য সরকারকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ করতে হয় না।
সরকারের সরাসরি কোনো বিনিয়োগও নেই। ফলে রপ্তানি আয় বা আরএমজি খাতের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ওপর গুরুত্ব আরও বাড়াতে হবে। তার জন্য দরকার প্রবাসে অবস্থানরত সোনার মানুষগুলোকে সঠিক মূল্যায়ন করা। দক্ষ, অতি দক্ষ ও প্রফেশনালস বেশি বেশি পাঠানো।
বন্ধ থাকা ট্রেডিশনাল শ্রমবাজার কুয়েত, কাতার, ওমান, ইরাক, মালয়েশিয়াসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী প্রেরণে মাইগ্রেশন ডিপ্লোম্যাসি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে ট্রেডিশনাল শ্রমবাজারগুলোতে দ্রুত কর্মী পাঠানো শুরু করা যায়। এর পাশাপাশি নতুন টেকসই শ্রমবাজার খুঁজে বের করা দরকার। জাপান, ইতালি, রাশিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশি কর্মী নিতে চাইলেও আমরা কেন সেসব দেশে উল্লেখসংখ্যক কর্মী পাঠাতে পারছি না তার কারণ অনুসন্ধান করা উচিত। শুধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর অনিয়মের দায় না চাপিয়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে বায়রা ছাড়াও প্রবাসী কল্যাণ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়সহ সিভিল এভিয়েশন, ইমিগ্রেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সরকারকে নীতি-কৌশলের মাধ্যমে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সম্পৃক্ত করে অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। যারা দেশের রিয়েল হিরো অর্থাৎ অভিবাসীদের সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান করে সম্মানিত করলে এবং একই সঙ্গে অধিক পরিমাণে দক্ষ, অতি দক্ষ ও প্রফেশনালস প্রেরণ করা সম্ভব হলে আশা করি চলতি ২০২৫ সালে ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্র্যাসি
ইমেইল : [email protected]