কথিত আছে প্রতিবেশী বদলানো যায় না। কিন্তু কথাটি সব সময় ঠিক নয়। কারণ প্রতিবেশীর বাড়ি যদি বিক্রি হয়ে যায় বা অন্য কেউ জোর করে দখল করে নেয়, তাহলে তো প্রতিবেশী পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রতিবেশীর চরিত্র বা শক্তি বদলালে তার আচরণও বদলে যেতে পারে। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতি যদি দেশের ক্ষেত্রেও ঘটে, সে ক্ষেত্রে নতুন প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে? সে আমার জন্য কতটা নিরাপত্তাঝুঁকির কারণ হতে পারে এবং তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে যদি কোনো রাষ্ট্র সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা না করে এগোয়, তাহলে সেই প্রতিবেশীর কাছ থেকে সুবিধা ও ভালো ব্যবহার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। যে অবস্থার মুখোমুখি আজ বাংলাদেশ। ভুলনীতির কারণে আরাকান আর্মি আমাদের বন্ধু না হয়ে আজ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে অথচ সাম্প্রতিক ইতিহাসেও মুসলিম-অধ্যুষিত রাখাইন বা আরাকান ছিল বাংলাদেশের অংশ। ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের কিছু মিল আছে। এখানকার ৪৫ লাখ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ছিল মুসলিম। আর এই মুসলিম-অধ্যুষিত রাজ্যটি স্বাধীনতা লাভ করলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক থাকারই কথা ছিল; কিন্তু হয়েছে তার বিপরীত; বিগত সরকারের ভুল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের কারণে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর এক ভুলে আরাকান যুক্ত হয় মিয়ানমারের সঙ্গে আর দ্বিতীয় বড় ভুলটা হলো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এই স্বাধীনতাকামী আরাকান আর্মি গত ৯ মাসে মিয়ানমার জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে রাখাইন প্রদেশের সিংহ ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। তারা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি Arakan People's Revolution Government গঠন করেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু কৌশলগত ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে এখন আরাকান আর্মির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে পড়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ যুক্ত রয়েছে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আরাকান বা রাখাইনে। ৮০ শতাংশ চীনের মালিকানায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়েছে রাখাইনে। এ বন্দর থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত দুটি পাইপলাইনের একটি দিয়ে পেট্রোলিয়াম এবং অন্যটি দিয়ে গ্যাস নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে চীনের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান প্রণালি মালাক্কা কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সেটিকে বাইপাস করে রাখাইনের এই গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে পণ্যসামগ্রী দেশটি নিয়ে আসতে পারবে। এই সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চীন বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি দ্বারও তৈরি করেছে।
আমেরিকা ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলো যে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত নীতি প্রকাশ করেছে, তাতে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনের বিভিন্ন জায়গায় কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে, যার মালিকানা মূলত চীন ও রাশিয়ার। আবার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় যে ছয়টি অর্থনৈতিক করিডর স্থাপন করা হবে, তার মধ্যে দুটি নৌভিত্তিক। এর একটি চীন-মিয়ানমার করিডর নামে পরিচিত। আমেরিকা এ অঞ্চলে তাদের প্রভাববলয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রাশিয়াও এই প্রতিযোগিতায় রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুর। আমেরিকা ইতোমধ্যে আরাকান অ্যাক্ট প্রবর্তন করেছে। এই আইনের মাধ্যমে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে তারা সহায়তা করতে পারে। এই অঞ্চলে আমেরিকা বনাম চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
রাখাইনের সিতওয়েতে চীনের তৈরি করা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলও এখন কিছুটা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছে। শিলিগুড়ি করিডরের বিকল্প হিসেবে ভারত যে কালাদান প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, তা এখন চীন-সমর্থিত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এতে করে রাখাইনে ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বও নতুন রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। চীন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমর্থন দিয়ে আসছে, আবার একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো সামনের দিনগুলোতে ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে ইন্দো-প্যাসিফিক এরিয়াতে নিবদ্ধ করবে বলে মনে হয়। এ জন্য তারা চাইছে চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে। এ কারণে তারা আরাকান আর্মিকে রাখাইনে সহযোগিতা দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তাকে দুর্বল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট এবং গণতন্ত্রপন্থিদের সহায়তা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি বলে মনে হচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের এসব কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করতে পারে। আবার আরাকান আর্মির সঙ্গেও তারা যোগাযোগ রক্ষা করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
আরাকান আর্মি ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু এ সুযোগ তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার হাতছাড়া করে। আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তারা রোহিঙ্গারা তাদের নিজভূমি রাখাইনে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারেও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিল। ‘ধর্ম বিবেচ্য নয়, জন্মসূত্রেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক’- ২০২২-এর জানুয়ারিতে এ মন্তব্য করেন রাখাইনের বৌদ্ধ সম্প্রদায় নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি প্রধান জেনারেল তোয়াই ম্রা নাইং (Major General Twan Mrat Naing)। অনলাইনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রদেশটির অধিকাংশ এলাকাই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। মুসলিম-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন দ্বন্দ্ব নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যেকোনো সহযোগিতায় আরাকান আর্মি প্রস্তুত।’ এমন সুযোগ হাতে পেয়েও হাত ছাড়া করেছে বিগত সরকার! এখন প্রশ্ন হলো, কার স্বার্থে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ভারত না চীন? পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে মিয়ানমার জান্তার পরাজিত একটি অংশের কিছু সেনা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাদেরও বিনা শর্তে মিয়ানমার সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয়, যার ফলে আরাকান আর্মি আবারও বাংলাদেশবিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা শুধু চীনের মধ্যস্থতা কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা প্রচেষ্টা ও চীনের ওপর নির্ভরতা এখন পর্যন্ত কোনো কাজে দেয়নি। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) ও আরাকান আর্মি তথা তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করতে হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের সঙ্গে আরাকানের সীমান্তের পুরোটাই এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া এই দুই অঞ্চলের মধ্যে চলমান কোনো বিষয়েই বাংলাদেশ কোনো অর্জন করতে পারবে না। ধরুন বাংলাদেশ যদি ইয়াবা বা অস্ত্র চোরাচালানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চায় তবে আরাকান আর্মির সহযোগিতা লাগবে। আর রোহিঙ্গা পুনর্বাসন বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই এ মুহূর্তে তাদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হবে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ধরনের একটি নন-স্টেট অ্যাক্টর (অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী)-এর সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে যোগাযোগ রাখবে? এ বিষয়ে নানা পথ ও পদ্ধতি বিভিন্ন রাষ্ট্র ব্যবহার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতারের মাধ্যমে তালেবানদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রক্ষা করেছে। ভারত ও চীন ইতোমধ্যে আরাকান আর্মির প্রতিনিধিদলকে নিয়ে দিল্লি ও কুনমিং (চায়নার ইউনান প্রদেশের রাজধানী) এ বৈঠক করেছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা যায়নি। এ মুহূর্তে আরাকান আর্মি বাংলাদেশের কাছ থেকে এ ধরনের যোগাযোগ ও বৈঠক আশা করে। এই ধরনের বৈঠকের পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গেও সম্পর্ক চালিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। এ ধরনের গৃহযুদ্ধে জড়িত রাষ্ট্রের প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই এই মুহূর্তে দরকারি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের করণীয় পদক্ষেপগুলো দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দলকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ কোনো পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তির দাবার চালের ঘুঁটি হতে চায় না, তাই সে হোক আমেরিকা, চীন বা ভারত। দ্বিতীয়ত অবশ্যই আমাদের নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে আমাদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক ও কূটনীতিকে নির্ধারণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি এই দুপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়া করে আমাদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা হাসিল করতে হবে। তৃতীয়ত নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াকে বাংলাদেশ সরকারের একটি আদর্শিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার এ বিষয়ে যত সময়ক্ষেপণ করবে ততই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
একই সঙ্গে মিয়ানমার ও আরাকানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয়েও বাংলাদেশকে এখনই নতুন করে ভাবতে হবে। ভবিষ্যতে মিয়ানমার সরকার ও রাখাইন বাংলাদেশের এক বিকল্প সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) হয়ে উঠতে পারে। আরাকান আর্মি যে কোনো সময় রাখাইন রাজ্য এবং নিজেদের অধিকৃত অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন অথবা স্বাধীন দেশের ঘোষণাও দিতে পারে। এমন কিছু হলে আরাকানের একমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। তাই জটিল এক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ। আরাকানকে নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তহীনতা ও দোদুল্যমানতা আমাদের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। আরাকানবিষয়ক একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচিত হওয়া দরকার।
♦ লেখক : এস কে তৌফিক এম হক, পরিচালক এসআইপিজি, এনএসইউ
এম এ রশীদ, সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি, এনএসইউ খান শরীফুজ্জামান, শিক্ষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি