জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের সভাপতির দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুজাদ্দেদী আলফেছানী। তবে দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় নিয়মবহির্ভূত সম্মানী গ্রহণ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে স্বপদে বহাল রাখা ও দুর্নীতিবাজ শিক্ষকদের আশ্রয় দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজটির পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সভায় সম্মানী নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও প্রতিসভায় তিনি নিচ্ছেন ১৮ হাজার টাকা। আর প্রতিমাসে একাধিক সভা আহ্বান করে গড়ে সম্মানীবাবদ তিনি পাচ্ছেন ৫০ হাজার টাকার বেশি। সেইসঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার ১০০ টাকা করে সম্মানী নিচ্ছেন। অথচ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের নীতিমালা অনুযায়ী, গভর্নিং বডির সভাপতি ও সদস্যদের নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানী ছাড়া অন্য কোনো সম্মানী নেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু বিগত ছয় মাসে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতিসহ সদস্যরা ছয় মাসে অন্তত তিন লাখ টাকারও বেশি সম্মানী নিয়েছেন।
বিধিমোতাবেক গত ৩০ নভেম্বর চাকরির বয়সসীমা শেষ হয়েছে বোরহানুদ্দীন কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষে নূরুল হকের। তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অভিযোগ, কলেজে একাধিক সিনিয়র শিক্ষক থাকলেও কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছেন না তিনি। বর্তমানের মেয়াদোত্তীর্ণ অধ্যক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিতে তাকে এখনো স্বপদে বহাল রেখেছেন। এমনকি এর আগে যে সকল শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের প্রমাণ আছে তাদের নানা আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেখেছেন অধ্যাপক মুজাদ্দেদী আলফেছানী।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম নিয়ে বর্তমান প্রশাসন দুর্নীতিবিরোধী কোনো তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেনি। কলেজের প্রয়োজনীয় নথিপত্র গায়েব করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জমি ক্রয়, অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও এফডিআর কেলেঙ্কারিসহ কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখা ব্রডশিট জবাব চাইলেও পরিচালনা পরিষদ তা দেয়নি।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট সম্পন্ন করতেও সহযোগিতা করছে না বর্তমান কলেজ প্রশাসন। ফলে, একদিকে যেমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুজাদ্দেদী স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবাই তাকে এই দুর্নীতির বিষয়ে অবহিত করেন। কিন্তু ছয় মাস পার হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। উপরন্তু সেই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকদের সঙ্গেই তার বেশি সখ্যতা গড়ে ওঠে। ফলে, তারা আগের চেয়ে এখন আরও ভালো অবস্থানে আছেন।’
জানা গেছে, এ সব দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জানুয়ারি ব্রডশিট জবাব চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ডিআইএ-এর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব অনিয়ম নিয়ে সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব না দিলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের এমপিও স্থগিত এবং গভর্নিং বডির অনুমোদন বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। তবে, নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও এসব অনিয়মের কোনো জবাব না দিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন কলেজটির অবৈধ অধ্যক্ষ।
এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা ২০১৯ সালের ঘটনা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এটা আমাদের উপর এসেছে। গত ২৯ জানুয়ারি যখন আমাদের কাছে চিঠি এসেছে তখন থেকে আমরা সেটা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। অনেকগুলো ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ায় আমরা এখনো সেটার জবাবে চিঠি দিতে পারিনি।’
ডিআইএ-এর ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি অল্প সময়ের মধ্যে কলেজটিতে ৪৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আপ্যায়ন ও সম্মানীবাবদ খরচ করা হয় ১৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার বেশি। সেইসঙ্গে নিয়ম না মেনে এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন কলেজের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক হারুনর রশীদ খান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষকদের বিধিবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয় উচ্চ বেতন। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ৪৫ শিক্ষকের অনেকে বাদ পড়লেও এখনো ১৯ জন স্বপদে বহাল আছেন।
এ বিষয়ে মুজাদ্দেদী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর অনেকগুলো কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি দেখেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছি। ধাপে ধাপে সব হবে।’
এদিকে কলেজের নামে ক্রয়কৃত জায়গা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটা তদন্তের জন্য গত ১২ জানুয়ারি চার সদস্যবিশিষ্ট একটা কমিটি গঠন করেন সভাপতি আল মুজাদ্দেদী আলফেছানী। যেখানে নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল থেকে বহিষ্কৃত দুই শিক্ষক এবং কলেজের অধ্যক্ষকে সদস্য সচিব করে একটা কমিটি গঠন করেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে এমপিও-এর বাইরে গিয়ে সৃষ্ট পদে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বছরে কলেজ ফান্ড থেকে বেতন দিচ্ছে এক কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এতে কলেজ ফান্ডের ওপর চাপ বাড়ছে। এর আগের বেসরকারি কলেজগুলোতে পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা টাকার বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিত। এনটিআরসিএ গঠনের পর কলেজগুলোতে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু গভর্নিং বডি নানা প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে। শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত ১০ জন নন-এমপিও শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন মুজাদ্দেদী আলফেছানী। এতে প্রতিবছর অন্তত ৩৬ লাখ টাকা কলেজের ফান্ড থেকে তাদের বেতন বাবদ দিতে হবে।
এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে মুজাদ্দেদী আলফেছানী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি শুধুমাত্র তাদের কন্সুলেট করেছি। তারা এর আগে পার্টটাইম শিক্ষক ছিলেন। আগে অনেককে কন্সুলেট করা হলেও এই কয়জনকে করা হয়নি। তাই, আমি তাদের কন্সুলেট করেছি মাত্র।’ তিনি বলেন, ‘একটা গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লেগেছে। তারাই আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।’
সম্মানী নেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক মুজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘আমরা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে সম্মানী নিয়েছি। একটা গ্রুপ আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।’.
অধ্যক্ষের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কলেজের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছি, বর্তমান অধ্যক্ষ সবচেয়ে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি। তাই, তাকে আমরা এ দায়িত্ব দিয়েছি। আর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন মোতাবেক পরিচালনা পরিষদের সভাপতির ইখতিয়ার আছে যে কাউকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার।’
সূত্র: সারাবাংলা ডটনেট
বিডি প্রতিদিন/হিমেল