পদ্মা নদীতে ফারাক্কা ও তিস্তায় গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০০টির মত নদ-নদী রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতিতে অতীত হয়ে গেছে। প্রকৃতি থেকে থেকে হারিয়ে গেছে এসব নদ-নদী। এর ফলে আবহাওয়া ও জলবাযুর পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব প্ররেছে। জীববৈচিত্র্য পড়েছে হুমকির মুখে। তিস্তা, ঘাঘট, ধরলা,পদ্মাসহ অন্যান্য নদীগুলো এখন হেঁটে পার হওয়া যায়।
নদীবিষয়ক গবেষক ও লেখকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা অববাহিকা অর্থাৎ রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ৫০ টির বেশি নদীর প্রবাহ থেমে গেছে গজলডোবা বাঁধের কারণে। দিনাজপুর,ঠাকুরগাও ও পঞ্চগড় জেলার ৪০ টির বেশি নদীর প্রবাহ নেই। অর্ধশতাব্দী আগে এসব নদীতে ছিল পানির প্রবাহ ও প্রাণের স্পন্দন। বর্তমানে অনেক স্থানে এসব নদীর কোন অস্তিত্বই দেখা যায় না। এছাড়া পদ্মা অববাহিকায়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট প্রায় ১০০ টি নদী কালের অতলে হারিয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থাও আরো করুণ। কুড়িগ্রামের চিলমারি এলাকায় শুকনো মৌসুমে এ নদী পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়।
শুকনো মৌসুমে তিস্তাতে থাকে হাটু জল। ডালিয়া থেকে কাউনিয়া পযর্ন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জেগে উঠে বিশাল চর। বগুড়ার প্রমত্তা করতোয়া
এখন ক্ষীণ খালের মত। তেমনি গাইবান্ধার ঘাঘট, কুড়িগ্রমের ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের অবস্থাও। এসব নদী শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়। পদ্মা নদীরও একই দশা। এখন নদীর শোঁ শোঁ ডাকতো দূরের কথা বালু আর আর বালু ছাড়া কোনো পানিও দেখা যায় না। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা শুকিয়ে অনেক স্থানে খালে পরিণত হয়েছে। এক সময় জীবন জীবিকার নির্ভর ছিল নদীর উপর। আবহমানকাল থেকে মাকড়াসার জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল শত শত নদী। ভাটিয়ালি, মারফতি, মুরর্শীদি গান গেয়ে পাল তোলা নৌকার মাঝিরা নদীর প্রাণকে সজীব করে তুলতো। পারাপারের জন্য ছিল অসংখ্য খেয়াঘাট। কিন্তু আজ কাল আর এসব দৃশ্য চোখে পড়ে না। ফারাক্কা–গজলডোবার বাঁধে নদীগুলো মরে গেছে।
উত্তরাঞ্চলে প্রকৃত রূপ থেকে প্রবাহ থমকে যাওয়া নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ধরলা, জলঢাকা, দুধকুমার, তিস্তা, স্বতী, ঘাঘট, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানাস, কুমলাই, লাতারা, ধুম, বুড়িঘোড়া, দুধ কুমার, সোনাভরা, হলহলিয়া, লোহিত্য, ঘর ঘরিয়া, ধরনী, নলেয়া, জিঞ্জিরাম, ফুলকুমার, কাটাখালী, শালমারা, রায়ঢাক, খারুভাজ, যমুনেশ্বরী, চিকলী, মরা করতোয়া, ইছামতি, আলাই কুমার ,মানাস,মরাতি, ইছামতি, পাগলা, চন্দনা, বারাহি, হাব, নবগঙ্গা, সর্বমঙ্গলা চিনারকুক,ভাঙ্গা, খলিসা, গদাই, প্রাচীণ ইছামতি,কমলা, নারদইত্যাদি। সূত্রমতে এক সময় শাখা নদী হিসেবে ওই সব নদী দাপটের সাথে এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে শাসন করতো। এসবের অনেক স্থানে নগরায়ন হয়েছে। আবার অনেক স্থান পরিণত হয়েছে আবাদী জমি।
নদী বিষয়ক গবেষক ও রিভারাইন পিপল কমিটির পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিদ ওয়াদুদ জানান, ফারাক্কা ও গজল ডোবা বাঁধের কারণে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-পদ্মাসহ প্রায় ২০০টির মত নদী অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তিস্তা এবং এর শাখানদীগুলো এই অঞ্চলের মানুষের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মায় পানি না থাকায় মেঘানা নদীর পানি প্রবাহ করে গেছে।
নদী বিষয়ক লেখক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, হারিয়ে যাওয়া নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারকে দ্রুততম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে এই অঞ্চলের মরুকরণ ঠেকানো যাবে না।
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল