প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৬৪টি জেলার নদী-খাল ও জলাশয় উদ্ধারে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিন এ হারিয়ে যাওয়া নদী ও খাল নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় নজরে আসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ফলে নদী, খাল ও জলাশয় উদ্ধারে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়েছে।
এদিকে, বগুড়ার ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া ২০ নদী ও খাল উদ্ধারের দাবি তুলেছেন জেলাবাসী। নদী এবং খাল পুন:খননে পানির ধারণ ক্ষমতাসহ কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে মৎস্য চাষের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় মাছের ব্যাপক প্রজনন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। দেশের ৯৪৮টি নদী পুন:উদ্ধার হলে ফিরে পাবে তাদের যৌবন। জোয়ারে ভাসবে পাল তোলা নৌকা। পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ঘুরবে এ অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্যের চাকা। কৃজি কাজে সেচ সুবিধাসহ মাছ চাষেও ফিরবে গতি।
জানা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলার অভ্যন্তরে ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুন:খনন প্রকল্প ২য় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রায় ৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৪৩৯টি উপজেলায় এই খনন কাজ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই হতে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের ৯৪৮টি নদীর নাব্যতাসহ কৃষি কাজে গতি ফিরবে। প্রকল্পটির পুন:খনন কাজের মোট দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ১৭৭ কিলোমিটার। এই প্রকল্পে বগুড়া জেলার ২০টি খাল ও নদী পুন:খনন করা হবে। ২০টি খাল ও নদীর মধ্যে রয়েছে-জেলার ধুনট উপজেলার চিকাবালা খাল, সারিয়াকান্দির দিবাহাড়ী খাল, বারমাসি খাল, গাবতলী উপজেলার গেন্দাখালী খালসহ, সারিয়াকান্দি উপজেলার সুখদহ নদী, শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনাই নদী ও করতোয়া নদী। এসব নদী-খাল ও জলাশয়গুলো খননের মাধ্যমে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বছরব্যাপী সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক নির্বাহী কমিটির প্রথম সভায় দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এই পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া ছোট নদী, খাল এবং জলাশয়গুলোর আনুমানিক ৭ লাখ ২০ হাজার হেক্টর নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ঝুঁকি কমিয়ে আসবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পুন:খননের মাধ্যমে ছোট নদী-৮৯টি, খাল-৮৩৩টি ও ২৬টি জলাশয় পুনরুজ্জীবিত হবে। নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার নৌ চলাচলের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত সম্ভব হবে। বগুড়া জেলাবাসী ২০টি নদী ও খাল পুন:খননের জন্য দাবি তুলেছেন।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, দেশের ৬৪টি জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুন:খনন প্রকল্প ২য় পর্যায়ের মধ্যে বগুড়ার ২০টি নদী ও খাল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সারিয়াকান্দি উপজেলার সুখদহ নদী, শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনাই নদী ও করতোয়া নদী। এই নদীগুলোতে এক সময় পাল তোলা নৌকা চলতো। এছাড়া নানা ধরনের কৃষি ফসল পরিবহন হতো নৌকা দিয়ে। বিভিন্ন হাটবাজারে নৌকা নিয়ে এই নদীপথেই চলাচল করতেন এলাকাবাসী। এখন দখল দূষণ আর তলদেশ ভরাটের কারণে নাব্যতা সংকটে এসব নদী। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীগুলোর নাব্যতা ফেরাতে কাজ করে যাচ্ছে। পুন:খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আবারো হারানো যৌবন ফিরে পাবে নদীগুলো।
অন্যদিকে, বগুড়ার ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সুখদহ নদী। নদীটির তলদেশ ভরাট, দখল, দূষণ আর পানি প্রবাহ না থাকায় দিনে দিনে খালে পরিণত হয়েছে এই নদী। বর্ষাকালে পানি দেখা গেলেও সারা বছর আর পানি থাকে না। এক সময় জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলায় কৃষি কাজে লাগলেও এখন সেই নদীতে চর জেগেছে। সুখদহ নদীতে এখন আর মাছ দেখা যায় না। ময়লা আবর্জনা জমে দুগর্ন্ধ ছড়াচ্ছে। বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদিঘী ইউনিয়নস্থ বালিয়াদিঘী মৌজা থেকে সুখদহ নদীটি সৃষ্টি হয়ে উত্তর পূর্ব দিকে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলায় প্রবেশ করেছে। এরপর সর্পিল আকারের এই সুখদহ নদীটি কয়েক কিলোমিটার ঘুরে আবারো গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়ন হয়ে পুনরায় সারিয়াকান্দি থানার ফুলবাড়ি মৌজা হয়ে নারচী ইউনিয়নস্থ নারচী, পরবর্তীতে বাঙালী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটি প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ। উজান থেকে আসা পলিজমে এবং কোথাও বন্দর এলাকায় মাটি ভরাটকরণের ফলে হারিয়েছে এর নাব্যতা এবং গতিপথ। নদীটি পুন: খননের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী।
শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও শিল্পপতি অধ্যক্ষ মীর শাহে আলম জানান, গাংনাই নদী বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত। নদীটির উৎপত্তিস্থল জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার শেষ সীমানা পানিতলা নামক স্থান থেকে। নদীটির শিবগঞ্জের আলিয়ারহাট এলাকায় সুইচগেট থাকায় শুষ্ক সৌসুমে গেইটটি বন্ধ করে কৃষি কাজে পানি সেচ ব্যবস্থা করা হয়। এই নদী খনন ও নাব্যতা ফিরে আনতে পারলে কৃষি ও মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটবে। এটি শিবগঞ্জের শেষ সীমানা করতোয়া নদীতে এসে মিলিত হয়েছে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার এই নদী পুন:খনন হলে ভরা মৌসুমে তার যৌবন ফিরে পাবে। এছাড়া জেলার প্রায় ২০টি নদী ও খাল উদ্ধারে পুন:খনন জরুরি।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, বগুড়ায় প্রথম পর্যায়ে প্রতি উপজেলায় একটি করে নদী খননের কাজ প্রায় শেষ। দ্বিতীয় পর্যায়ে বগুড়াসহ দেশের অন্যান্য নদীগুলো খননের জন্য প্রকল্প দেয়া আছে। প্রকল্পটি পাস হলে সুখদহ নদীসহ জেলার ২০টি ছোট নদী ও খাল পুন:খনন কাজ শুরু করা হবে। ফলে বগুড়ায় কৃষি জমিতে সেচসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষে বিপ্লব আসবে।
বিডি প্রতিদিন/আরাফাত