দেশে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আত্মহত্যা করছেন। প্রেমঘটিত কারণ, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক টানাপোড়েনসহ বিভিন্ন কারণে নারীরা এ ঘটনা ঘটাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরী ও নারীরা আত্মহত্যা করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন। ফলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে নারী ও মেয়েদের মধ্যে বিষণœতা দেখা দিলেই কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে মোট ১৭৯ জন নারী আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার জন্য আত্মহত্যা করেন ১৭৪ জন। ধর্ষণের কারণে তিনজন এবং যৌন হয়রানির কারণে দুজন আত্মহত্যা করেন। বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের ‘২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা : সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় সম্প্রতি জানানো হয় যে, নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। গত বছর মোট ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে নারীদের হার মোট আত্মহত্যার ৬১ শতাংশ, যা পুরুষ শিক্ষার্থীদের (৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ) চেয়ে বেশি।
জানা গেছে, নারীদের ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত কারণে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া অভিমান, পারিবারিক টানাপোড়েন, লেখাপড়ার চাপ, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, পরিবারের সদস্যদের অবহেলা, প্রিয়জনের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, প্রেমের সম্পর্কে টানাপোড়েন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, যৌন হয়রানি, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলসহ বিভিন্ন কারণে নারী-কিশোরীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। নারী শিক্ষার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং তুলনামূলক দুর্বল মানসিক স্থিতিশীলতার কারণে তারা সহজেই হতাশা ও সংকটে ভেঙে পড়ে, যা পরে আত্মহত্যায় গিয়ে শেষ হয়। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জাহানারা বেগম (৫০) নামের এক নারী গত ১ ফেব্রুয়ারি গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জাহানারা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সবুজবাগ থানার কদমতলা হিরাঝিল রোডের একটি বাসার নিচ তলায় তানিয়া আক্তার (২৫) নামের আরেক নারী তার প্রেমিক লাইসুরকে ভিডিও কলে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার আগের স্বামী বেশ কয়েক বছর আগে মারা যান। তানিয়া সাত বছরের একটি মেয়ে রেখে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সারা পৃথিবী জুড়েই নারীদের বিষণœতার মাত্রা পুরুষের তুলনায় বেশি। বিষণœতার কারণে নারীদের আত্মহত্যার হারও বেশি। একজন নারী যখন মনে করেন যে, বেঁচে থাকার তুলনায় মরে যাওয়া ভালো- তখনই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। নারীদের অনেকে পারিবারিক ঝামেলার কারণে আত্মহত্যা করেন। আবার নারীদের পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় মূল্যায়ন না করার কারণে তারা মনঃকষ্ট থেকে আত্মহত্যা করেন। নারীরা কেউ কেউ দীর্ঘ সময় কষ্টের জীবন নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়ার পথ বেছে নেন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে হলে মা ও তার মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মেয়েরা যেন তাদের মনের কথা মায়ের কাছে নির্দ্বিধায় বলতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালের সময়টা বেশ আবেগের। এ সময় একজন কিশোরী ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ জন্য ভুল সিদ্ধান্ত থেকে মেয়েটি যেন কোনো ভয়ংকর পথ বেছে না নেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এখন মেয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক ভঙ্গুরতা অনেক বেশি। ছোট আবেগ থেকেই তারা মন খারাপ বা অভিমান করে। এ জন্য নারী ও মেয়েদের মধ্যে বিষণœতা দেখা দিলেই তাদের জন্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।