সবাইকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেল ছোট্ট আছিয়া। কোনোভাবেই আটকে রাখা গেল না মাগুরায় ভয়ংকর ধর্ষণের শিকার আট বছর বয়সি মেয়েটিকে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। গতকাল দুপুর ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে। আইএসপিআর-এর বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়। যে কোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছে সেনাবাহিনী। মাগুরার নোমানী ময়দানে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় শিশুটির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ইফতারের আগে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তার লাশ মাগুরায় নেওয়া হয়। এ সময় সঙ্গে ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, মাগুরা জেলা প্রশাসক অহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
আছিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি অপূর্ব জাহাঙ্গীর জানান, প্রধান উপদেষ্টা নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। শিশুটির মৃত্যুর খবরে শোক জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ধর্ষকের বিচার দাবি করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, শিশুটি ইতিহাসের করুণ সাক্ষী হয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুর ১টার দিকে দুনিয়া ছেড়ে সারা বাংলাদেশকে কাঁদিয়ে চলে গেল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...। তিনি অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৯০ দিনের ভিতরে শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান। এ ঘটনায় পুরো বাংলাদেশ আছিয়ার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, লজ্জিত বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। মাগুরা শহরতলির নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে গত ৬ মার্চ শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। শিশুটির মা ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় এ ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। এই মামলার আসামিরা হলেন- শিশুটির ভগ্নীপতি সজীব হোসেন (১৮) ও বোনের শ্বশুর হিটু মিয়া (৪২), সজীব শেখের অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাই (১৭) এবং তাদের মা জাবেদা বেগম (৪০)।
মামলার নথিতে বলা হয়, সজীবের সহায়তায় তার বাবা হিটু মিয়া শিশুটিকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি জাবেদা ও তার ছোট ছেলেও জানত। ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটিকে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা। নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে নেওয়া হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৬ মার্চ আছিয়াকে ঢাকা মেডিকেলের পিডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরে শুক্রবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর শিশুটির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলেও সন্ধ্যায় তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে-সিএমএইচে নেওয়া হয়।
গতকাল সকালে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, ‘আজ সে আরও দুবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়বার প্রায় ৩০ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পর হৃৎস্পন্দন ফিরেছে, তবে মস্তিষ্ক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। ‘কোমা স্কেলে (জিসিএস) মাত্রা ৩, যা গভীর অচতেন অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। শিশুটির রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রাও বিপজ্জনকভাবে কম।’
হাসনাত-সারজিসের কাঁধে শিশু আছিয়ার লাশ : মাগুরার নোমানী ময়দানে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় শিশুটির জানাজা শেষে আছিয়ার লাশের খাটিয়া ঘাড়ে করে নিয়ে যান হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম। এর আগে শিশুটির জানাজায় অংশ নিতে মাগুরায় পৌঁছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম।
ধর্ষকের বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতার আগুন : মাগুরা প্রতিনিধি জানান, এশার নামাজের পর জানাজা শেষে আছিয়ার আদি নিবাস শ্রীপুরের সোনাইকুন্ডীতে তাকে দাফন করা হয়। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। রাত পৌনে ৮টার দিকে বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়।
ধর্ষকদের প্রকাশ্য বিচার দাবি হেফাজতে ইসলামের : মাগুরায় যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু আছিয়ার মৃত্যুতে দলের পক্ষ থেকে গভীর শোক জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমান। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা শোক প্রকাশ করে ধর্ষকদের প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিতের দাবি করেছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু আছিয়া আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছে। তার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক জানাচ্ছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জানাচ্ছি।
ঢাবিতে আছিয়ার গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী কফিন মিছিল : আছিয়ার মৃত্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী কফিন মিছিল করেছে ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ। গতকাল রাত পৌনে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে আছিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পড়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেকুল ইসলাম। গায়েবানা জানায় উপস্থিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, আছিয়ার মৃত্যু আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। দ্রুত সময়ে এই ভয়াবহ হত্যার বিচার হবে, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে একটি প্রতীকী কফিন মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। এদিন সন্ধ্যা ৭টায় দেশব্যাপী লাগাতার ধর্ষণের বিচার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অপসারণ, ‘আছিয়া হত্যার’ বিচারসহ একাধিক দাবিতে মশাল মিছিল করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি জোট। বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে এই মশাল মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি নীলক্ষেত হয়ে হলপাড়া ঘুরে আবার টিএসসিতে এসে শেষ হয়। মিছিল শুরুর আগে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশে গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, আজ ধর্ষণের শিকার হয়ে আমাদের বোন আছিয়ার মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর সঙ্গে আমরা কেউ প্রতারণা করবো না। এই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ করিয়েই আমরা আমাদের আন্দোলন শেষ করবো। মশাল মিছিলের আগে তারা শিশু আছিয়ার মৃত্যুতে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন।
হেফাজত নেতারা বলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আছিয়ার খুনি ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক প্রকাশ্য বিচার দাবি করছি এবং প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানাচ্ছি, যাতে এমন পাশবিক অপরাধ করার সাহস আর কেউ না করে। প্রকাশ্যে ধর্ষকদের শাস্তি দেওয়া হলে এমন অনেক অপরাধ রোধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। ইসলাম এজন্যই এসব অপরাধের শাস্তি প্রকাশ্যে দেওয়ার বিধান রেখেছে। তারা আরও বলেন, আট বছরের শিশুকন্যা আছিয়ার নৃশংস ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা জাহেলি যুগের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।
নেতারা বলেন, ইসলামে ধর্ষণকারীকে জনসম্মুখে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তাদের শাস্তি দিতে যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয় এবং মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ২) রাসুল সা.-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে বিশ্বনবী (সা.) ধর্ষককে হত্যার শাস্তি দেন। অর্থাৎ ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তারা আরও বলেন, ইসলাম নারীর অধিকারের সুস্পষ্ট ঘোষণায় নারীর যথাযথ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছে এবং মানবতার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ই সর্বপ্রথম নারী জাতির পূর্ণ মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইসলামের আগে জাহেলি আরব সমাজে নারীর মর্যাদাপূর্ণ কোনো অবস্থান ছিল না। নারীরা হলো আমাদের মায়ের জাতি। দেশের ওলামায়ে কেরাম নারী সমাজের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সব সময় সোচ্চার রয়েছেন।