বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একজন আপসহীন নারী। গৃহবধূ থেকে নানান চড়াই -উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনবার। ১৯৯১ সালে প্রথমবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থায় (সার্ক) দুবার চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার একটি অনন্য রেকর্ড হচ্ছে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতেই তিনি জয়লাভ করেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। ১৯৬০ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার জিয়াউর রহমানের বিয়ে হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার সংহতি ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শাহাদাতবরণ করেন। সে সময় খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন তিনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশাহারা। জিয়াউর রহমানের পরে দলের হাল কে ধরবে, সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। বছরখানেক যেতে না যেতেই নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় প্রশংসা অর্জন করেন। পরের বছর মার্চে তিনি দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং একই বছরের ১০ মে চেয়ারপারসন পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলের চতুর্থ কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বার এবং ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের দশম কাউন্সিলে চতুর্থবারের মতো বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। দল ঐক্যবদ্ধ রেখে আপসহীনভাবে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেনের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর তিনি আইনি লড়াই করে সব কটি মামলায় জামিনে মুক্তি পান। কারাগারে থাকাকালে তাঁকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর প্রতিহিংসাবশত খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছিল। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাঁর সাজা হয়েছিল। গত ৬ আগস্ট সরকারের নির্বাহী আদেশে তাঁর সাজা মওকুফ করা হয়। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলমান। রাজনীতিতে যোগ দিয়েই স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে আপসহীন নেত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের একজন আপসহীন নারী। তিনি শুধু একজন আপসহীন নারীই নন, তিনি জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রতীক।