রাত ২টা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন চেপে ধরে আছেন। তাঁর ছেলের অপারেশন হয়েছে, জরুরি রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু রমজান মাস হওয়ায় পরিচিতদের অনেকেই ক্লান্ত, কেউ কেউ দ্বিধান্বিত। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে রক্ত থাকলেও চিকিৎসক বলছেন, রোগীর জন্য তা উপযুক্ত নয়। হতাশ হয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘কেউ কি নেই, যে এই পবিত্র রমজানে আমার ছেলেটার জন্য একটু রক্ত দেবে?’ রমজান আত্মসংযম ও আত্মত্যাগের মাস। এই মাসে ইবাদতের পাশাপাশি মানবসেবারও গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে, রোজা রেখে রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে বা এটি রোজা ভঙ্গ করবে। অথচ ইসলামিক দৃষ্টিকোণ, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, সামাজিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রমজান রক্তদানের জন্য কোনো বাধা নয় বরং এটি মানবতার এক মহান দৃষ্টান্ত হতে পারে।
ইসলাম সব সময় মানবসেবাকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল (সুরা মায়েদা : ৩২)।’ রোজা সংযমের শিক্ষা দেয়, কিন্তু এটি মানবসেবার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। অনেক ইসলামি বিশেষজ্ঞের মতে, যদি রক্তদান দুর্বলতার কারণ না হয়, তবে এটি রোজা ভঙ্গ করে না। তবে কেউ যদি রক্ত দেওয়ার ফলে অস্বস্তি বা দুর্বলতা অনুভব করেন, তাহলে ইফতারের পর বা সাহরির আগে রক্তদান করাই উত্তম। নবী করিম (সা.) দয়া, সহযোগিতা ও মানবসেবার আদর্শ রেখে গেছেন। সুতরাং রোজা রেখে যদি কারও জন্য রক্তদান প্রয়োজন হয়, তাহলে তা করাই উত্তম কাজ।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে রমজানে রক্তদান
বৈজ্ঞানিকভাবে রক্তদান নিরাপদ, তবে রোজার মধ্যে রক্তদানের আগে ও পরে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন-
১. রক্তদানের সময় :
* সাহরির পর বা ইফতারের দুই-তিন ঘণ্টা পর রক্ত দেওয়া সর্বোত্তম।
* ইফতারের ঠিক আগে বা ক্লান্ত অবস্থায় রক্তদান না করাই ভালো।
২. পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার :
* রক্তদানের আগে ও পরে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
* খেজুর, দুধ, ফলমূল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তদানের পর দুর্বলতা কম অনুভূত হয়।
৩. বিশ্রাম :
* রক্তদানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া ভালো, বিশেষ করে গরমের দিনে।
* মাথা ঘোরা বা ক্লান্তি অনুভব হলে শুয়ে থাকতে হবে।
সামাজিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা
রমজানে রক্তদাতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক রোগী বিপদে পড়েন। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। যারা অসুস্থ হচ্ছেন তারা এই দেশেরই নাগরিক। তাই নাগরিক হিসেবে তারও অধিকার রয়েছে বেঁচে থাকার, এবং সেটি রাষ্ট্রের আরেক নাগরিক এগিয়ে এলেই সম্ভব। কারণ বিজ্ঞান অনেক উন্নত হলেও রক্তের বিকল্প এখনো বের করতে পারেনি।
সাধারণ জনগণের করণীয়
১. রোজার কারণে রক্তদান এড়িয়ে না গিয়ে ইফতারের পর বা সাহরির আগে রক্তদানের পরিকল্পনা করা। ২. রক্তদানের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালানো। ৩. পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবকে রক্তদানে উৎসাহিত করা। ৪. জরুরি রক্তের জন্য ব্লাড ব্যাংক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।
হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকের ভূমিকা
১. রমজানের আগে পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া। ২. ইফতারের পর রক্তদান কর্মসূচি চালু করা। ৩. গরমে রক্তদাতাদের জন্য উপযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা। ৪. হাসপাতালের ভিতরে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো।
সরকার ও প্রশাসনের করণীয়
১. রমজানের সময় রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো। ২. সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্লাড ব্যাংক সমৃদ্ধ করা। একটি ব্লাড ব্যাংকের সঙ্গে অপর ব্লাড ব্যাংকের যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা নেই আমাদের দেশে। তাই রোগীরা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ান যখন নিজেদের রক্তদাতা থাকে না। এই জায়গায় সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে। ব্লাড ব্যাংকগুলোর সব তথ্য নিয়মিত আপডেট করা থাকলে সরকারের তরফ থেকেই সরাসরি তথ্য পেতে পারে রোগীর স্বজনরা। এতে ভোগান্তি ও প্রতারণা কমে। ৩. রক্তসংকট মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রক্তদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া। ৪. জরুরি রোগীদের জন্য রক্ত মজুতের বিশেষ ব্যবস্থা করা। রমজান আত্মসংযম ও মানবসেবার মাস। এই মাসে রক্তদান শুধু একটি মানবিক কাজই নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও হতে পারে। যদি শরীর সুস্থ থাকে, তবে রোজা রেখেও রক্ত দেওয়া সম্ভব। সঠিক সময়ে, সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে রক্তদান করলে এটি রোজাদারদের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। বরং এটি একদিকে ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়ন করবে, অন্যদিকে একজন অসহায় রোগীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে রমজানে রক্তসংকট দূর করা সম্ভব। তাই আসুন, রমজানে রক্তদানের গুরুত্ব বুঝি এবং অন্যকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ