বাংলাদেশের আজকের কৃষি শুধু মাঠ, ফসল আর শ্রমের গল্প নয়; এটি হলো এক অনন্য সংগ্রামের কাহিনি। এ সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে অবদান রাখছেন এ দেশের নারীরা। গ্রামবাংলার শস্যখেতে, মাছের ঘেরে, গবাদিপশুর খামারে, নারীর পরিশ্রম ছাড়া কৃষির অগ্রগতি ছিল অসম্ভব।
সূর্যের দেখা প্রতিদিন না-ও পাওয়া যেতে পারে, ঘন কুয়াশা বা মেঘের আড়ালে সূর্য লোকালেও খাদ্য উৎপাদনের তাগিদ থেকে প্রতিদিনই মাঠে নামে একদল কর্মঠ হাত। এঁরা কৃষকের স্ত্রী, কন্যা বা কৃষকের মা অথবা নিজেরাই কৃষানি। পরিবারের সচ্ছলতা আর দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করছেন তাঁরা। বলা হয় নারীর হাতেই পৃথিবীতে কৃষির সূচনা। সত্যি বলতে হাজার বছর ধরে প্রত্যক্ষভাবেই নারীরা কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফসল ফলানো ও পরিচর্যার কাজটুকু পুরুষের হাতে হলেও ফসল প্রক্রিয়াজাত করার কাজটুকু নারীরাই করে আসছেন। কিন্তু তাঁর সে কাজটুকু ধর্তব্য হয়নি যুগের পর যুগ। সেই আশির দশকে যখন ‘মাটি ও মানুষ’ তৈরি করতে ঘুরে বেড়াচ্ছি দেশের আনাচকানাচে। তখন থেকে দেখেছি আমাদের দেশেও কৃষির গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশে রয়েছে নারীর অবদান। সে সময় একবার ভেবেছিলাম নারী ঠিক কতটুকু কৃষিতে জড়িত তা বোঝা যেত একটা পরিসংখ্যান বের করা গেলে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটা পরিসংখ্যান তখন পেয়েছিলাম। ‘বিশ্বজুড়ে কৃষিতে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিশ্রমিকের ৭০%, খাদ্য উৎপাদনকারীদের ৮০%, খাদ্যসামগ্রীর প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণে ১০% নারী। গ্রামীণ কৃষি বিপণনের ৬০-৯০ শতাংশ নারীর দখলে। এভাবে কৃষি উৎপাদনে যুক্ত কর্মী সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই নারী।’ (খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ১৯৮৫)।
বলছিলাম আমাদের দেশে নারীদের কৃষিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের কৃষি কখনোই পূর্ণাঙ্গ নয়। কিন্তু এক আজব কারণে নারীরা অবহেলিত হয়ে আসছে। গত শতাব্দীর সেই আশির দশক থেকে দেখে এসেছি কৃষিশ্রমিক হিসেবে নারীরা মূল্যায়িত হয়েছে পুরুষের অর্ধেক হিসেবে। অর্থাৎ একজন পুরুষ শ্রমিক যদি মজুরি ১০০ টাকা পান, তবে নারী পায় ৫০ টাকা। অথচ নারী কাজটুকু করেন অনেক মমতা নিয়ে। তবে এ বৈষম্যের বিষয়গুলো পাল্টাচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা নিজেদের মতো কৃষিতে অবদান রাখছেন। অনেকে যুক্ত হচ্ছেন কৃষি উৎপাদনে, অনেকেই গড়ে তুলছেন কৃষিবাণিজ্যের ক্ষেত্র। পাঠক, আজ আমার এ লেখায় আমাদের দেশে কয়েকজন নারীর গল্পই তুলে ধরতে চাই।
ঈশ্বরদীর নুরুন্নাহারের গল্পটাই বলি। বছর পনেরো আগে ঈশ্বরদীতে গিয়েছিলাম স্থানীয় এক কৃষকের কৃষি সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে। কাজের এক ফাঁকে এক নারী এসে বলল- স্যার, আপনার অনুষ্ঠান দেখে আমিও কৃষিকাজ করছি। আমার বাগানটা একটু দেখবেন। বললাম, ‘নিশ্চয়ই দেখব। কাজটা শেষ করি।’ কাজ শেষে গিয়ে দেখি একটা পেঁপের বাগান, কয়েকটা গাছ। উৎসাহিত করলাম। ধীরে ধীরে বাগান আরও বড় করতে বললাম। আমার কথা শুনে কেঁদে ফেলল। আগ্রহী হলাম তাঁর জীবনের গল্পটা শুনতে। ভেজা কণ্ঠে বলতে শুরু করল। বিয়ে হয়ে আসার পর শাশুড়ি তাঁর হাতে একটা ইট আর একটা পাটের বস্তা তুলে দিয়েছিলেন। ইটটি ছিল তাঁর মাথার বালিশ আর পাটের বস্তাটি ছিল কাঁথা। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে খুঁজছিলেন মুক্তির পথ। পাশের বাড়ির টেলিভিশনে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে ভাবলেন বাগান করবেন। কিন্তু প্রথম বাধাই আসে পরিবার থেকে। নারী হয়ে এসব তিনি পারবেন এ বিশ্বাসটাই তাদের ছিল না। অহেতুক সময় নষ্ট হচ্ছে ভেবে লাগানো গাছ কেটে দিয়েছে। সব শুনে আমি তাকে উৎসাহ দিয়ে এলাম। বললাম, আপনি আপনার কাজ চালিয়ে যান। আমি আগামী বছর আপনার ওপর প্রতিবেদন তৈরি করব। নুরুন্নাহার থামেননি। তাঁর দুর্দম ইচ্ছার কাছে সবকিছু পরাজিত হয়। তিনি শ্রমে-ঘামে ঠিকই ছিনিয়ে আনেন আপন সাফল্য। ক্রমেই বেড়েছে তাঁর আবাদের পরিধি। গরুর খামার, মাছের পুকুর, ফল-ফসলের চাষ। কৃষিকে ঘিরেই তাঁর যত কাজকর্ম। এ ২০ বছরে একাধিকবার তাঁর ওপর প্রতিবেদন তৈরি করেছি। সব বাধা পেরিয়ে এখন তিনি একজন সমাজ উন্নয়নকর্মী ও নারী উদ্যোক্তা। নিজের দরিদ্রতা দূর করে সবজি, ফলমূল, পোল্ট্রি ও গাভির খামার করে এলাকার নারীদের কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আরেক নারী রাজিয়া সুলতানা ছিলেন গৃহিণী। শৈশব থেকে হৃদয়ে লালন করেছেন কৃষির প্রতি টান। বিয়ের পর স্বামীর চাকরির জন্য ঘুরতে হয়েছে জেলায় জেলায়। কখনো সিলেট, কখনো রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম বিভিন্ন জেলা ঘুরে থিতু হয়েছিলেন সাভারে। সাভারে এসে অল্প অল্প জমি লিজ নিয়ে তৈরি করেছেন কৃষির ক্ষেত্র। শুরু ২০১৪ সালে। প্রথমে দুই বিঘা, এরপর পাঁচ বিঘা। এভাবে অল্প অল্প করে আঠারো বিঘা জমি লিজ নিয়ে তৈরি করেন তাঁর স্বপ্নের কৃষিখামার। ব্রুকলি, ক্যাপসিকাম, চেরি টম্যাটো, ক্যাবেজ, রেডবিট, সেলেরি, চাইনিজ ক্যাবেজসহ নানা রকমের বিদেশি সবজি ফসল। তিনি বছরে ছয় মাস সবজি চাষ করেন। আর বাকি সময় গরু-ছাগল পালন করেন। প্রতি মৌসুমে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকার সবজি উৎপাদন হয় তাঁর খামারে। তাঁর খামারেই এখন প্রায় শতজনের কর্মসংস্থান।
মিরপুরে পারভীন নামের এক নারী নিয়েছেন কৃষিকে নিয়ে অন্যরকম এক পদক্ষেপ। চার হাজার বর্গফুটের একটি ফ্লোরে তিনটি রুমে শুরু করেন ঘরোয়া কৃষির কাজকারবার। ৪০টি র্যাকে প্রতি মাসে গড়ে ৮০০ সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করছেন তিনি। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে শতভাগ ‘গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ অনুসরণ করে উৎপাদন করছেন লেটুস, বকচয়, চেরি টম্যাটো আর ক্যাপসিকাম। উদ্যোক্তা পারভীন বলছিলেন, নতুন প্রজন্মকে নতুন কৃষির সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়াও একটি লক্ষ্য তাদের। সেখানে পারভীনের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে রাদিয়া, রিয়ানাসহ বেশ কয়েকজন তরুণ কাজ করেন। আধুনিক এ প্রযুক্তির কৃষিতে দারুণ আগ্রহ তাঁদের। শার্ট, প্যান্ট, জুতা পরেই দিব্যি কাজ করা যাচ্ছে সেখানে। বিদেশি সংস্থার করপোরেট চাকরি ছেড়ে পারভীন নিজের স্বপ্ন রচনা করছেন প্রযুক্তির কৃষিতে।
আমি আরও এক নারীর কথা বলতে চাই। মদিনা আলী। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। দেশের বাইরে বর্ণাঢ্য জীবনের হাতছানি ছেড়ে দেশে ফিরে কাজ করছেন কৃষকদের জন্য। ডা. চাষি নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন। অ্যাপটির মাধ্যমে ছবি তুলে কৃষক নির্ণয় করতে পারছে ফল-ফসলের নানান সমস্যা। মিলছে তার সমাধানও।
মদিনা আলীর সংগঠন চাষিদের স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর এ অসাধারণ প্রচেষ্টার জন্য তিনি ভূষিত হয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড চ্যানেল আই অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ডে। শুধু মদিনা আলী নয়, সেরা কৃষক নারী হয়েছেন হোসনে আরা রহমান, সেরা সংগ্রামী কৃষক হয়েছেন রেশমা ও শাপলা। তাঁদের একেকজনের জীবনের গল্পও অদ্ভুত সংগ্রামমুখর। তাঁদের কথাও একদিন আপনাদের সামনে তুলে ধরব।
আমাদের দেশে অসংখ্য নারীর হাতে সমৃদ্ধ হচ্ছে আজকের কৃষি। তাঁদের সবার কথায় রচিত হতে পারে বিশাল গ্রন্থ। আজ থেকে শত বছর আগে নারীমুক্তির বার্তা নিয়ে সুলতানার স্বপ্ন লিখেছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। আজ যেন আমরা এ সংগ্রামী নারীদের ভিতর সেই মুক্তিসন্ধানী স্বনির্ভর নারী সুলতানার প্রতিকৃতিই দেখতে পাই। আজকের দিনে কৃষিতে বহুমুখী পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নারীর নিরন্তর শ্রম ও নিষ্ঠা। আমার প্রত্যাশা বাণিজ্যিক হিসাব ও বোঝাপড়া নিয়ে কৃষিতে এগিয়ে আসবেন আরও অনেক নারী।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব