‘দাবানল’- পৃথিবী বিধ্বংসী এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এটি মূলত প্রকাণ্ড এক আগুনের স্রোত; যা যে কোনো অঞ্চলকে নিমিষেই পুড়িয়ে দিতে পারে। পরিণত করতে পারে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরীতে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ পৃথিবীকে নানা দুর্যোগের কোলে ঠেলে দিচ্ছে। এর জ্বলন্ত এক উদাহরণ হলো দাবানল। যদিও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বিজ্ঞানীরাও বারবার এ ব্যাপারে সতর্কতা দিয়ে আসছেন। জাতিসংঘ বলছে, এই শতকের শেষাংশে এমন বিধ্বংসী দাবানলের ঘটনা আরও প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এ তালিকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পশ্চিম আমেরিকা, উত্তর সাইবেরিয়া মধ্য ভারত এবং পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার দেশগুলো। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো- ‘ক্যালিফোর্নিয়া দাবানল’। যা আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানলের তকমা পেয়েছে...
ক্যালিফোর্নিয়ার ‘প্যালিমেডস ফায়ার’
আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড- ‘ক্যালিফোর্নিয়া দাবানল’
২০০০ সাল থেকে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) প্রতিবছর গড়ে ৭০,৬০০টি দাবানলের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সাম্প্রতিককালের দৃশ্যপট বিবেচনা করে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ (আগুনের সূত্রপাত : ৭ জানুয়ারি) ধরে একাধিক দাবানলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস। এখনো এ অঞ্চলে তিনটি বড় দাবানল জ্বলছে। এরই মধ্যে গত ২৪ জানুয়ারি অন্যতম ধনী শহর লস অ্যাঞ্জেলেসে নতুন করে আবার দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ জানুয়ারি) ৯ হাজার ৪০০ একরেরও বেশি ভূমি গ্রাস করেছে আগুন। স্থানীয় প্রশাসন সেখান থেকে ৩১ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় শক্তিশালী সান্তা আনা বাতাস এবং শুষ্ক পরিস্থিতির কারণে জানুয়ারি মাসে একাধিক তীব্র দাবানল গোটা লস অ্যাঞ্জেলেসে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুটা হয় প্যালিসেডস ফায়ার দিয়ে, ৭ জানুয়ারি সকালে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যাসিফিক প্যালিসেডসে (পূর্বে অবস্থিত একটি পাড়া) একটি ঝোপঝাড়ের আগুন দাবানল হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই দাবানলটি প্রায় ২৩ হাজার ৪৪৮ একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেস্ট্রি এবং ফায়ার প্রোটেকশন (ক্যাল ফায়ার) জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহের দাবানলে ১২ হাজারের বেশি বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এমন ভয়াবহতায় অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে কিছু লোক তাদের বাড়ি রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেছেন। সংবাদমাধ্যম সূত্র বলছে, লস অ্যাঞ্জেলেসে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের মধ্যে সর্ববৃহৎ দাবানল হলো- প্যালিসেডস ফায়ার। এর ক্ষয়ক্ষতির পরিধি ৩৬ দশমিক ৬ বর্গমাইলেরও বেশি।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, দাবানলে কমপক্ষে ২৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৭ জন ইটন ফায়ারে এবং ১১ জন প্যালিসেডস ফায়ারে নিহত হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ লাখেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যখন দমকলকর্মীরা দাবানলের আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে আসছিলেন। এর পরবর্তী দিন এবং সপ্তাহগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্যালিসেডস এবং ইটন দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকা পুনরায় বসবাসের যোগ্য করার ঘোষণা দিয়েছেন। ভয়াবহ দাবানলগুলো হলিউডপাড়াসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের পুরো পাড়া এবং ব্লকগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ফলে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। জিপিএর্মকান-এর তথ্য অনুসারে, দাবানলের কারণে বিমা ক্ষতি ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর লস অ্যাঞ্জেলেসের মোট অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল দাবানল। এর আগে ২০১৮ সালের ক্যাম্প ফায়ার থেকে সৃষ্ট দাবানলে প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বিমা ক্ষতি হয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী এই আগুনের পেছনে থাকা পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি মানুষের কারণে সৃষ্ট ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় আগুন শুরু হওয়ার সময় উদ্ভিদের চরম শুষ্কতার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রায় এক-চতুর্থাংশ শুষ্কতার জন্য দায়ী। তারা বলেন, গ্রীষ্ম ও শরৎকালের চরম তাপ পাহাড়ের ঢালের ঝোপঝাড় ও ঘাসগুলোকে শুকিয়ে দিয়েছে, যা আগুন ধরে গেলে জ্বালানি হিসেবে আরও তীব্রভাবে পুড়তে সহায়তা করেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা না বাড়লে আগুন চরম হতো ঠিকই, তবে সেগুলো ‘কিছুটা ছোট এবং কম তীব্র’ হতো।
জলবায়ু বিজ্ঞানী পার্ক উইলিয়ামস (ইউসিএলএর ক্লাইমেট অ্যান্ড ওয়াইল্ডফায়ার রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ) এবং তার সহকর্মী অ্যালেক্স হল, গ্যাভিন মাদাকুম্বুরা এবং অন্যরা মিলে একটি বিশ্লেষণ প্রস্তুত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘এই ধ্বংসাত্মক আগুনের জন্য তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে খুব বেশি জ্বালানি সরবরাহ, অত্যন্ত শুষ্ক জ্বালানি (ঝোপঝাড় ও শুষ্ক উদ্ভিদ এবং মৌসুমের অত্যন্ত শক্তিশালী সান্তা আনা বাতাস লস অ্যাঞ্জেলেসের দুর্ভাগ্য বাড়িয়েছে। তারা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার অত্যন্ত শুষ্ক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন, যেখানে আট মাস ধরে উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আবহাওয়া স্টেশনে ১ মে থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে মাত্র ০.২৯ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা ১৮৭৭ সালের পর দ্বিতীয় শুষ্কতম হিসেবে স্থান পায়। গবেষকরা জানান, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার তাপমাত্রা মৃত উদ্ভিদের ‘জ্বালানি আর্দ্রতা’ কমে যাওয়ার জন্য আংশিক দায়ী। তারা অনুমান করেছেন, অস্বাভাবিক তাপ উদ্ভিদের শুষ্কতার জন্য প্রায় ২৫% দায়ী, যেখানে বৃষ্টিপাতের অভাব বাকি ৭৫%-এর জন্য দায়ী। যখন শক্তিশালী সান্তা আনা বাতাস আসে, এটি আগুনের উচ্চ ঝুঁকির সব কারণকে একত্রিত করেছিল।
দাবানল কী?
শুষ্ক বনাঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে সৃষ্ট আগুন বনাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ‘দাবানল’ হিসেবে পরিচিত। বনের ভিতরে ঘন ঝোপঝাড় এবং পরস্পর সংস্পর্শে থাকা গাছপালা স্বতঃস্ফূর্ত দহনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এমতাবস্থায় ছোট একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট গোটা বনভূমিকে ভয়াবহ অঙ্গারে পরিণত করার জন্য। ‘দাবানল’ মূলত একটি আগুনের স্রোতের মতো যা মূলত মুহূর্তের মধ্যে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে গোটা একটি অঞ্চল।
দাবানল কেন হয়?
‘দাবানল’ পৃথিবীর জন্য চরম বিধ্বংসী হতে পারে, যা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ছড়ায়, উদ্ভিদ ধ্বংস করে এবং মানব সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে। বিভিন্ন কারণে ‘দাবানল’ সৃষ্টি হতে পারে। মূলত এর প্রধান কারণ- ‘কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে খরা হয়। আর এই খরা এবং শুকনো উদ্ভিদ দাবানল তৈরি করে। শুকনো জায়গায় দ্রুত আগুন ধরে। তখনই হয় দাবানল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দাবানলের স্ফুলিঙ্গের সাধারণ প্রাকৃতিক কারণ থাকে বজ্রপাত। মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাম্প ফায়ার, সিগারেটের উচ্ছিষ্ট বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি।
এর ক্ষতিকর প্রভাব
♦ দাবানলের কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ছড়ায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ এবং এটি পরিবেশ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যাহত করতে পারে। ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
♦ দাবানল মানুষকে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। গকেষকদের ভাষ্য, প্রতিবছর কয়েক শ মানুষ দাবানলে প্রাণ হারান। আরও অনেক বেশি মানুষকে (১০ হাজার বা কয়েক লাখ) সরিয়ে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হন। তাছাড়া বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
♦ দাবানল প্রাণীদেরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বেশির ভাগ সময় দাবানলের কারণে ‘বন উজাড়’ হয়। এই বনাঞ্চলের উদ্ভিদ, যা এক সময় প্রাণীদের বসবাসের জায়গা (আবাসস্থল) হিসেবে কাজ করত, তা ধ্বংস হওয়ায় ওই অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
♦ দাবানল বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কাঠামো ধ্বংস করতে পারে। স দাবানল পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
♦ দাবানলের আবর্জনা নদী ও জলাশয়গুলোকে বন্ধ করে দিতে পারে, যা বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়। জলাধারগুলোয় নাইট্রোজেন এবং দ্রবীভূত কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা ১৫ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি করে।
দাবানলের ‘বৈশ্বিক প্রভাব’
দাবানল বৈশ্বিক আবহাওয়ার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে। দাবানল প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে, তবে অনেক সময় মানুষের কার্যকলাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তন এর ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ১৫টি বড় দাবানলের ঘটনা ঘটে। যা সে বছরে ৯ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি ধ্বংস করে। শতাব্দীর শুরু থেকে ২০২৩ সালটি সবচেয়ে খারাপ বছর ছিল। সে বছরে কানাডায় সবচেয়ে বড় দাবানল দেখা যায়। ফলে বিলিয়ন বিলিয়ন মেট্রিক টন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়েছিল। ২০২৪ সালের প্রথম বড় দাবানল শুরু হয়েছিল পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত অ্যামাজনে। সে বছরে ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় বড় অগ্নিকাণ্ডের দেখা মেলে। ইউরোপের অঞ্চলগুলোয় প্রায়শই দাবানল আঘাত হানছে। গ্লোবাল ওয়াইল্ডফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেম-এর তথ্যমতে, দাবানল প্রতিবছরই লাখ লাখ হেক্টর বনভূমিগুলোকে গ্রাস করে। নিচের ছবিতে প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের কারণে ২০১২ সাল থেকে বার্ষিক মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান দেখানো হলো-
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ সারা বিশ্বের দাবানলের মাত্রাকে আরও খারাপ করে তুলছে। জাতিসংঘের মতে, চলতি শতাব্দীর শেষনাগাদ দাবানলের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। যেখানে পশ্চিম আমেরিকা, উত্তর সাইবেরিয়া, মধ্য ভারত এবং পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই কয়েক দশক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে অনেক বেশি অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হচ্ছে। এখানে ইতিহাসের ‘বিধ্বংসী দাবানল’ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হলো-
পৃথিবী নামক গ্রহে দাবানলের (অগ্নিকাণ্ড) ইতিহাস নতুন নয়। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুসারে, পৃথিবীতে রেকর্ড করা সবচেয়ে প্রাচীনতম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে প্রায় ৪২০ মিলিয়ন বছর আগে। সিলুরিয়ান পিরিয়ডের শেষের দিকে গঠিত শিলা ও কাঠকয়লা থেকে এটি শনাক্ত করা হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিশ্বের অনেক দেশের বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির কারণ ‘দাবানল’। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক দাবানল দুটি সংঘটিত হয় আমেরিকায়। ১৮৭১-এর গ্রেট ফায়ার-এ বিক্ষিপ্তভাবে পেশটিগোর দাবানল, শিকাগো দাবানল, মিশিগান দাবানল এবং অন্টারিওর দাবানলে সব মিলিয়ে ছিল প্রায় ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। অন্যদিকে ১৯১০ সালের গ্রেট ফায়ার অব কানেকটিকাটের অগ্নিকাণ্ড ৮৫ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। ১৯১৮ সালের মিনেসোটার ক্লোকেট ফায়ারে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫৩। ১৯১৯ সালে কানাডার গ্রেট ফায়ারে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৮৭ সালে চীন ও রাশিয়ায় ব্ল্যাক ড্রাগনের অগ্নি তাণ্ডবে ২১১ জন প্রাণ হারান। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্ল্যাক স্যাটার্ডে বুশফায়ারে ১৭৩ জন এবং কানাডার মিরামিচি ফায়ারে ১৬০ জনের প্রাণ যায়। তাছাড়া ১৯৮৯ সালে কানাডার ম্যানিটোবা ওয়াইল্ডফায়ারস ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন একর জমি ধ্বংস করে ফেলে। এমনকি ২০১১ সালের রিচার্ডসন ব্যাককান্ট্রি ফায়ারও প্রায় ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন একর বোরিয়াল বনাঞ্চলকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। ২০১৯/২০২০ অস্ট্রেলিয়ান বুশফায়ার হাজার হাজার ভবন ধ্বংস করে এবং কয়েক ডজন মানুষসহ ৩ বিলিয়ন প্রাণীর জীবন কেড়ে নেয়। এর মধ্যে ৬১ হাজার কোয়ালার প্রাণহানি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস নগরীর ওয়াইল্ডফায়ারসে প্রায় ১ মিলিয়ন একর জমি পুড়ে গিয়েছিল। ভয়ংকর এমন অগ্নিকাণ্ড বা দাবানলের এই রেকর্ডগুলো আজও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ওপর আস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। বলে রাখা ভালো- বনভূমির আগুন নির্দিষ্ট অঞ্চলে কিছু একটি সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। যেমন- সাইবেরিয়া (রাশিয়া), ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন, ওরেগন, টেক্সাস, ফ্লোরিডা (যুক্তরাষ্ট্র), ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (কানাডা) এবং অস্ট্রেলিয়া। বিশেষত ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বা টাইগা জীবমণ্ডলযুক্ত এলাকাগুলোয় দাবানলের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত যে কোনো দাবানল নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে থাকলে একে ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবেই ধরা হয়। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেই তা বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দাবানল বিধ্বংসী হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন।
থমাস ফায়ার
২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার পাউলার উত্তরে থমাস ফায়ার পাওয়ার লাইনের কারণে সৃষ্ট আগুন জ্বলে ওঠে। এক নজিরবিহীন দুর্যোগ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার থমাস ফায়ার রেকর্ড গতিতে ছড়ায়। ডা রাজ্যের ভেন্টুরা এবং সান্তা বারবারা কাউন্টিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ৪৪০ বর্গ মাইলেরও বেশি এলাকা পুড়িয়ে ফেলে। এটি ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার অতীতের রেকর্ডকৃত অন্যতম বৃহৎ অগ্নিকাণ্ড। এতে দুজনের প্রাণহানি ঘটে। তন্মধ্যে একজন দমকলকর্মী ও একজন সাধারণ নাগরিক। আগুন সান্তা পাউলার কাছে শুরু হওয়ার ৪০ দিন পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এর আগে এই আগুন ১ হাজারের বেশি স্থাপনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
সিডার ফায়ার
২০০৩ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় আরেকটি অগ্নিকাণ্ড প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করেছিল। রাজ্যটির ক্লিভল্যান্ড ন্যাশনাল ফরেস্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত। অগ্নিকাণ্ডের তদন্তকারী দলের রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় শুষ্ক আবহাওয়া এবং প্রবল বাতাসের কারণে এই অগ্নিকাণ্ড এক ডজনেরও বেশি দাবানলের সৃষ্টি করে; যা ২৫ অক্টোবর ২০০৩ থেকে ৫ নভেম্বর ২০০৩ পর্যন্ত সান ডিয়েগো কাউন্টিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই অগ্নিকাণ্ড ২ লাখ ৭০ হাজার একরেরও বেশি এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং ১৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। সেই সময় সিডার ফায়ার ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম এবং ধ্বংসাত্মক দাবানল ছিল।
দ্য গ্রেট ফায়ার (১৯১০ সাল)
১৯ শতকের যুক্তরাষ্ট্রে যেসব বিপর্যয়ের কথা শোনা যায়, ‘দ্য গ্রেট ফায়ার’ তার অন্যতম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল। এই মহা আগুন, যা ‘বিগ বার্ন’ বা ‘বিগ ব্লোআপ’ নামেও পরিচিত। ফলাফলও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বনভূমির এই আগুন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের (আইডাহোর ওয়ালেস শহরের পূর্বদিক) ৩ মিলিয়ন একর জমি পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। এর তাণ্ডবে মারা যান ৮৭ জন মানুষ। এদের অধিকাংশই দমকলকর্মী। এই অগ্নিকাণ্ড দেশটির ফরেস্ট সার্ভিসকে প্রভাবিত করে। ফলে অগ্নি সুরক্ষা আইন হয়। যার মধ্যে স্মোকি দ্য বেয়ারও অন্তর্ভুক্ত।
ব্ল্যাক ফ্রাইডে বুশফায়ারস
১৯৩৯ সালের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ বুশফায়ারস। এটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ আগুন হিসেবে পরিচিত। ফলাফল হিসেবে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রায় ৫ মিলিয়ন একর জমি ধ্বংস হয়েছিল। কয়েক বছরের খরা, উচ্চ তাপমাত্রা এবং শক্তিশালী বাতাসের কারণে দাবানলটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে; যা রাজ্যের তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে; যা অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী বুশফায়ার হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৩৯ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল এ দাবানলের স্থায়িত্ব।
সাইবেরিয়ান তাইগা ফায়ারস
দাবানল সৃষ্টি হলে তা কয়েক ঘণ্টা বা দিনের ব্যবধানে যে সবকিছু একেবারে নিবে যাবে তা একেবারেই নয়। এর বড় উদাহরণ সাইবেরিয়ার তাইগা ফায়ারস। এটি এক উষ্ণ গ্রীষ্মকালে পূর্ব সাইবেরিয়ার তাইগা অরণ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। আর সেটি ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গের আকারে ২০২২ সালের মে মাস থেকে শুরু হয়ে এখন অবধি জ্বলছে। এটি সাইবেরিয়া, রুশ পূর্বাঞ্চল, উত্তর চীন এবং উত্তর মঙ্গোলিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ৫৫ মিলিয়ন একর (২২ মিলিয়ন হেক্টর) জমি ধ্বংস করে ফেলে। এটি প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করেছে।
চিনচাগা ফায়ার
এই অগ্নিকাণ্ড যা ‘উইস্প ফায়ার’ বা ‘ফায়ার নাইন্টিন’ নামেও পরিচিত। ১৯৫০ সালের জুন থেকে শরৎকালের শুরু পর্যন্ত উত্তর ব্রিটিশ কলম্বিয়া এবং আলবার্টায় জ্বলেছিল। এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে পরিচিত। এলাকার বসতি কম থাকায় মানুষের ওপর এর প্রভাব সীমিত ছিল। তবে এটি অবাধে পুড়তে থাকে। প্রায় ৪.২ মিলিয়ন একর (১.৭ মিলিয়ন হেক্টর) বোরিয়াল বনাঞ্চল পুড়ে ছাই করে ফেলে। এর থেকে সৃষ্ট ধোঁয়াকে বলা হয় ‘গ্রেট স্মোক পল’। কারণ এর ফলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সূর্যকে দেখাই যায়নি।