বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত কয়েকটি ‘হারিয়ে যাওয়া’ এয়ারলাইনসের মধ্যে রয়েছে- প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ (প্যান অ্যাম), ব্রানিফ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজ, এয়ার বার্লিন, ফ্লাইবি, মিডওয়ে এয়ারলাইনস, ব্রিটিশ মিডল্যান্ড রিজিওনাল (ফ্লাইবিএমআই) এবং এয়ার ইতালি। এসবই বিভিন্ন কারণে- যেমন দেউলিয়াত্ব বা একীভূতকরণের কারণে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে
এককালে সুপরিচিত ছিল যেসব এয়ারলাইনস
প্যান অ্যাম, ট্রান্স ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইনস। গত শতাব্দীর এই বিখ্যাত নামগুলো পাঠকদের কাছে সুপরিচিত। কিন্তু প্যান অ্যাম শেষবার উড়েছিল ৩৪ বছর আগে ২০০১ সালে। অর্থাৎ এটি ২৪ বছর বিমান পরিষেবা দিয়ে এসেছে। এর বাইরে আরও বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এয়ার বার্লিন, ট্রান্সায়েরো এবং কিংফিশার। অন্যান্য বিখ্যাত নামগুলোর মধ্যে মার্জার অধিগ্রহণের কারণে অন্য এয়ারলাইনসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউএস এয়ারওয়েজ, নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইনস এবং কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইনস, সেই সঙ্গে ভার্জিন আমেরিকা এবং আমেরিকা ওয়েস্ট ও অন্যরা। এই এয়ারলাইনসগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কারণগুলো ব্যাপকভাবে ভিন্ন হলেও, সেগুলোকে মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কম চাহিদা এবং পরিবর্তিত রুচির অধীনে রাখা যেতে পারে। আমরা জানি, এয়ারলাইনস শিল্পের জন্য একটি উত্তাল সময় ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর। যা চারটি মার্কিন বিমানকে নামিয়ে এনেছিল। দুটি নিউইয়র্ক সিটির ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে, একটি ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে এবং একটির মিশন যাত্রীদের দ্বারা ব্যর্থ হয়েছিল যারা বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিল, যার ফলে বিমানটি তার উদ্দেশ্যমূলক লক্ষ্য, যা ওয়াশিংটন ডিসির ইউএস ক্যাপিটল ভবন বলে মনে করা হয়েছিল। তার পরিবর্তে পেনসিলভানিয়ার সোমারসেট কাউন্টির একটি খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছিল যা মহামন্দা ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসে এবং করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্বজুড়ে জীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে, লাখ লাখ মানুষ মারা যায় এবং বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে বিমান সংস্থার তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে অসংখ্য এয়ারলাইনস।
ফ্লাইবি
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে বুকিংয়ে ধস নামা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে, তখন (মার্চ মাসে) যুক্তরাজ্যের এয়ারলাইনসে ফ্লাইবিতে ধস নামে। কম বাজেটের এই এয়ারলাইনস ২০১৯ সালে তার ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে। এক সময় এটি ছিল ইউরোপের বৃহত্তম স্বাধীন আঞ্চলিক এয়ারলাইনস এবং ২০০টিরও বেশি রুটে চলাচল করত। ২০২০ সালে ফ্লাইট বাতিল, বিমান গ্রাউন্ড এবং এয়ারলাইনস কর্মীদের বিনা বেতনে ছুটি নিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
ট্রান্স ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইনস
১৯২৭ সালে ট্রান্স ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইনস তাদের যাত্রা শুরু করে। ১৯৩০ সালে এটি আমেরিকান, ইস্টার্ন এবং ইউনাইটডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিগ ফোর’ এয়ারলাইনসে স্থান করে নেয়। ১৯৩৯ সালে আমেরিকান মহাকাশ প্রকৌশলী হাওয়ার্ড হিউজের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ায় এর ফ্লাইট সম্প্রসারণের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৮ সালে কার্ল আইকান-ইঞ্জিনিয়ার্ড লিভারেজড বাইআউটের অধীনে সংস্থাটি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে ও দেউলিয়া হয়। ২০০১ সালে বিমান সংস্থাটি তার শেষ ফ্লাইটটি পরিচালনা করে।
কিং ফিশার এয়ারলাইনস
কিংফিশার এয়ারলাইনস; যা ২০০৩ সালে ভারতীয় বিলিয়নিয়ার বিজয় মাল্য লাভ করেন। ২০১২ সালে বন্ধ হওয়ার আগে এয়ারলাইনসটি ২০০৫ সালে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু করে। এমনকি তারা ওয়ানওয়ার্ল্ড জোটে যোগদানের গ্রিন সিগন্যালও পেয়েছিল। এয়ারলাইনসের ওয়ানওয়ার্ল্ড স্পনসর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ দ্বারা তত্ত্বাবধানকৃত প্রস্তুতি পর্যালোচনা সফলভাবে সম্পন্ন করার পরে। বিমানটি সে সময় ৫৪টি গন্তব্যে পরিষেবা দিত। যার মধ্যে ৪৬টি ভারতে ছিল; দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং মুম্বাইয়ে। তীব্র আর্থিক ক্ষতির কারণে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন; যা ওঅঞঅ নামে পরিচিত। কিংফিশারকে স্থগিত করে, যা তার ওয়ানওয়ার্ল্ড পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়। এটি ইন-ফ্লাইট পরিষেবার জন্য পরিচিত ছিল।
বাংলাদেশেও বন্ধ যত এয়ারলাইনস
বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইনসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সব মিলিয়ে আজ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস এভিয়েশন লাইসেন্স পেলেও এখন টিকে আছে মাত্র কয়েকটি বেসরকারি বিমান সংস্থা। ১৯৯৫ সালে বেসরকারি এয়ারলাইনস হিসেবে প্রথম লাইসেন্স পায় অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স। দুই বছর পরে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে তারা যাত্রী পরিবহন শুরু করে। তবে সেটি এক বছরও টেকেনি। এর পরে একে একে অনেক এয়ারলাইনস লাইসেন্স পেলেও সেগুলোর মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় জিএমজি এয়ারলাইনস, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, জুম এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার ও রয়েল বেঙ্গল এয়ার। এগুলোর মধ্যে শুধু জিএমজি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু রেখেছে।
ট্রাম্প শাটল
আশির দশকের শেষের দিকে নিউইয়র্কের ‘রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) একের পর এক সম্পত্তি কিনছিলেন, তন্মধ্যে আছে ম্যানহাটনের প্লাজা হোটেল। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এক্সক্লুসিভ এয়ারলাইনস ক্লাবে যোগ দেন তখন তিনি লাফিয়ে ওঠেন। তাতে বোঝাই যাচ্ছিল- এভিয়েশন সম্পর্কে না বুঝে, না শুনেই নেমে পড়েন। এতে ট্রাম্প পুরোনো ৭২৭ বিমানের একটি বহর পেলেন। যার দায়িত্বে ছিল এয়ারলাইনস ‘ইস্টার্ন শাটল’। বিমানগুলো নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন ডিসি এবং বোস্টন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করত এমনকি সেগুলো ইস্টার্ন এয়ারলাইনসের প্যারেন্ট কোম্পানি তা বিক্রির জন্য রেখেছিল। ট্রাম্প বিমানে তার নাম লাগিয়ে এবং ভিতরের সামান্য পরিবর্ধনে (ক্রোম-ফক্স মার্বেল বসিয়ে) লাখ লাখ ডলার খরচ করলেন কিন্তু এটি কখনো লাভজনক হয়নি। পরে ১৯৯০ সালে ট্রাম্প এটি বিক্রি করতে বাধ্য হন।
আমেরিকান স্মোকার্স কাব
এয়ারলাইনসটির পুরো নামন্ড দ্য গ্রেট আমেরিকান স্মোকার্স কাব; যা ছিল রয়্যাল ওয়েস্ট এয়ারলাইনসের একটি স্পিনঅফ। ১৯৮০-এর দশকে এর স্টার্টআপ, যা প্রথমে ওয়েস্ট কোস্টের স্থানগুলো যেমন- বারব্যাঙ্ক থেকে লাস ভেগাস এবং কলোরাডো তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। যখন বাকি এয়ারলাইনস শিল্প ধীরে ধীরে নির্ধারিত ফ্লাইটে যাত্রীদের সিগারেটের ধোঁয়া (ধূমপান) নিষিদ্ধ করতে শুরু করেছিল, তখন এই রয়্যাল এয়ারলাইনসটি এক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যার নাম ‘দ্য গ্রেট আমেরিকান স্মোকার্স কাব’। তারা যাত্রীদের সর্বত্র ধূমপানযোগ্য ফ্লাইট পরিচালনা করে, যা ছিল কেবল ডালাসভিত্তিক এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ‘ধূমপায়ীদের ধূমপানের অধিকার’ নিয়ে সংগ্রাম করা। তাদের দাবি, এয়ারলাইনসগুলো তাদের সদস্যদের প্রতি ‘দ্বিতীয় শ্রেণির আচরণ’ করছে। ১৯৮৮ সালে ফ্লাইটে ধূমপান নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর এটি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্সিয়াল এয়ারওয়েজ
প্রেসিডেন্সিয়াল এয়ারওয়েজ, যা মূলত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক্স-পিপল এক্সপ্রেস-এর নির্বাহীরা। আমেরিকার ওয়াশিংটন ভিত্তিক এই প্রেসিডেন্সিয়াল এয়ারওয়েজ তাদের সস্তা বিমানের মডেলের উন্নতি করতে চেয়েছিল, পাশাপাশি তারা একটি পূর্ণ পরিষেবা এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করত তাও খুবই সস্তা ভাড়ায়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস এয়ারপোর্টে নতুন একটি টার্মিনালে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এককালে দাপিয়ে বেড়ানো মিনা সংস্থাটি রাজধানীর জনগণের জন্য ‘ওভাল অফিস’ নামে একটি ভিআইপি (ঠওচ) লাউঞ্জ এবং পূর্ব উপকূলসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিষেবা প্রদান করত। ১৯৮৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মাইকেল ডুকাকিস তার নির্বাচনি প্রচারণায় তাদের একটি বিমান ভাড়া করেছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও এয়ারলাইনস ইতিহাস হয়ে যায়। পরবর্তী বছরেই বিমান সংস্থাটি দেউলিয়া হয়ে যায়।
চ্যালেঞ্জ ইন্টাঃ এয়ারলাইনস
বিমান সংস্থাটি কেবল নামেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসলে একটি এয়ারলাইনস কোম্পানির নাম যদি ‘চ্যালেঞ্জ’ রাখা হয়, তাহলে এটি যে কোনো প্রকার আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারে না তারই এক দারুণ উদাহরণ। কিন্তু এই এভিয়েশন কোম্পানিটির অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই সম্ভবত ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে বেশ কয়েকটি এভিয়েশন নির্বাহীদের মধ্য থেকে এক প্যাসেঞ্জার সিবলিং তৈরির দিকে নজর দিয়েছিলেন। তাদের সব মালবাহী এয়ারলাইনসের জন্য ৭২৭ এবং ৭৩৭ বিমানের বহর ব্যবহারের পূর্ব উপকূলের শহর নিউইয়র্ক থেকে মিয়ামি, ক্যারিবিয়ান এবং মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন পয়েন্টে ফ্লাইট পরিচালনা করত। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা কখনো সফলতা খুঁজে পায়নি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে টাকা শেষ করে দেওয়ার পর এটি দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন তার নামটিও একটি হাসির পাত্র হয়ে ওঠে।
পিপল এক্সপ্রেস
জেটব্লুর আগে ছিল পিপল এক্সপ্রেসের কাল্ট, যা ১৯৮০ এর দশকের শুরুতে তার চৌকশ এবং ভবিষ্যৎ অন্তদৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতা ডন বার-এর নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করেছিল। পরক্ষণে তা মিডিয়ার প্রিয় হয়ে ওঠে। হার্ভার্ডে শিক্ষিত এই ব্যবসায়ী ছিলেন বিমান সংস্থা শিল্পে দারুণ এক অভিজ্ঞ ব্যক্তি কিন্তু তার নিজস্ব বিমান সংস্থার জন্য প্রণয়ণকৃত ধারণাগুলো তখনকার সাদামাটা শিল্পকে বিস্মিত করেছিল। তার কর্মীরা বিভিন্ন কাজের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাজ করতেন। পাইলটরা ব্যাগ লোড করতেন এবং আর্থিক বিশ্লেষকরা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। গ্রাহকরা বিমানে বসে তাদের টিকিটের টাকা দিতেন। উত্তর-পূর্বে একমুখী যাত্রী পরিবহন এবং বিজ্ঞাপন ছাড়াই এই ফ্লাইট পরিষেবা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর ডন বার খুব বেশি উচ্চাকাক্সক্ষী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি ব্যবহৃত ৭৪৭ কিনলেন এবং এতে প্রথম শ্রেণির ফ্লাইট যোগ করলেন। লন্ডন ও অন্যান্য ইউরোপীয় রাজধানীতেও ফ্লাইট চালু করলেন। কিন্তু পূর্বে লাভজনক এই সংস্থা দ্রুত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৮৭ সালে এটি কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইনস অধিগ্রহণ করে।
হাইল্যান্ড এক্সপ্রেস
ভার্জিন আটলান্টিকের প্রতিষ্ঠাতা আইনজীবী র্যান্ডলফ ফিল্ডসের মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা ছিল, হাইল্যান্ড এক্সপ্রেস, যা প্রথম (এবং সম্ভবত একমাত্র) বাজেট ট্রান্স আটলান্টিক লাইনের বিমান ফ্লাইট হবে, যা স্কটল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোয় পরিবহনের সুযোগ অর্জন করে। ফিল্ডস রিচার্ড ব্র্যানসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর এই এয়ারলাইনস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি ভার্জিন শেয়ারে বিপুল লাভবান হন। সেই লভ্যাংশের অর্থ ব্যবহার করেন একটি ৭৪৭ বিমানের মালিকানা অর্জনে এবং এটি প্রেস্টউইক, স্কটল্যান্ড থেকে নিউইয়র্কে একমুখী টিকিটে যাত্রী পরিবহন করত। প্রাথমিকভাবে তিনি উৎসাহিত হয়ে ১৯৮৭ সালে লন্ডন গ্যাটউইক থেকে একটি ফ্লাইট যোগ করেন। কিন্তু এর পরে আর্থিক ক্ষতি বাড়তে থাকে এবং তার পরপরই হাইল্যান্ড এক্সপ্রেস থেমে যায়।
MGM গ্র্যান্ড এয়ার
বিলিয়নিয়ার কির্ক কেরকোরিয়ান; যিনি লাস ভেগাস ক্যাসিনো তৈরি করেন। তিনি একদিন ভাবলেন, তার জন্য এক নতুন সুযোগ এসেছে একটি সম্পূর্ণ প্রথম শ্রেণির বিমান সংস্থা গড়ার। তিনি কিছু বিমান নিয়েছিলেন, পুরোনো কোচ সিটগুলো উঠিয়ে তাদের মধ্যে চামড়ার সোয়িভেল চেয়ার, কুইন সাইজের বিছানা, টক্সিডো পরা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এবং স্ট্যান্ড-আপ বার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝি সময় লস অ্যাঞ্জেলস থেকে নিউ ইয়র্ক MGM বিমানবন্দরে বিলাসবহুল শিডিউল ফ্লাইট চালু হয়েছিল, যা তারকাদের আকৃষ্ট করলেও (ম্যাডোনা, অ্যাক্সেল রোজ) এবং ২ হাজার ডলারে রাউন্ড ট্রিপ টিকিট কখনো লাভবান হয়নি। ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এটি বন্ধ হয়ে যায়।
দ্য লর্ডস এয়ারলাইনস
দ্য লর্ডস এয়ারলাইনস; যার টিকে থাকার জন্য কেবল একটু সাহায্য দরকার ছিল। এর মূল ব্যবসায়িক প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে এর ধারণা ছিল যে, ‘তাপমাত্রা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ’ তৈরি করা। যা নব জাগরণী বা পুনর্জীবিত হওয়ায় বিশ্বাসীদের জন্য এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি করবে। তার ধারাবাহিকতায় আমেরিকার মিয়ামি থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব পর্যন্ত ডিসি-৮ ফ্লাইটের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর নির্বাহী কর্তারা তাদের প্রত্যাশিত লাভের একটি বড় অংশ ‘লর্ডস মিনিস্টি’তে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তাদের অর্থ শেষ হয়ে যায়, তখন তাদের এই স্বপ্ন এবং ‘বিশ্বাসের আত্মা’ বিমানটি চিরকালের মতো মাটিতে ধসে পড়ে এবং বন্ধ হয়ে যায়।
প্রাইড এয়ার
নিউ অরলিন্সভিত্তিক প্রাইড এয়ার সেই সময়কার অন্যতম নাটকীয় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়, যখন ১৯৮০ এর দশকে শিল্প বিপ্লবী ফ্রাঙ্ক লরেঞ্জো, যিনি একটি ছোট এয়ারলাইন চালাতেন, এমনকি কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইনসের অধিগ্রহণ করেন। ফলে কোম্পানিটি চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া হয়ে পড়ে। হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। তন্মধ্যে কিছু কর্মী সিদ্ধান্ত নেন প্রতিশোধ নেওয়ার। তারা এমন এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠা করেন যা ভালো সেবা এবং ভালো ব্যবস্থাপনার মডেল হবে। সানবেল্টের বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। তবে তারা সফল হননি। ছোট, কম অর্থায়িত এয়ারলাইনস বড় এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকা যে কত কঠিন এটি মাত্র তিন মাস পর ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে বন্ধ হয়ে যায়।
দ্য হাওয়াই এক্সপ্রেস
৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে তৎকালীন বিমানগুলো নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে বেশ হিমশিম খায়। তখন আমেরিকান এক ব্যবসায়ী মাইকেল হার্টলি এমন একটি সফল ধারণা পেয়েছিলেন, যা থেকে প্রায় নিশ্চিত সফলতা আসে। তা হলো- একটি ৭৪৭ বিমানে ৫০১টি সিটভর্তি যাত্রী পরিবহন করা (যা একটি প্রচলিত, মাল্টি-ক্লাস লেআউটের তুলনায় প্রায় ৪০০টি সিট)। তিনি লস অ্যাঞ্জেলস থেকে হনুলুলুর টিকিট কম দামে বিক্রি করলেন। যার নামকরণ করেছিলেন ‘দ্য বিগ পাইনারপল’। ওই রুটের এয়ারলাইনসগুলো খুব তাড়াতাড়ি তার এই কার্যকলাপে শিক্ষা পেল এবং নিজেদের ভাড়াও হাওয়াই এক্সপ্রেসের দামে নামিয়ে নিল। যখন হাওয়াই এক্সপ্রেস পরবর্তীতে তাদের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে গ্রাহক হারিয়ে ফেলে এবং বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ATA এয়ারলাইনস
১৯৭৩ সালে চার্টার কোম্পানি হিসেবে তারা যাত্রা শুরু করে। ATA মূলত ১৯৮৬ সালে মধ্য-পশ্চিম ফ্লোরিডা পর্যন্ত ফ্লাইটের মাধ্যমে তাদের নির্ধারিত কার্যক্রম শুরু করে। অবকাশকালীন রুটে পরিষেবা প্রদান করে থাকে; যা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এই এয়ারলাইনসের বিশেষত্ব হয়ে ওঠে। ইন্ডিয়ানাপলিস এবং শিকাগো-মিডওয়ে বিমানবন্দর অঞঅ হাব হিসেবে কাজ করত। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক মন্দায় একের পর এক এয়ারলাইনস আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরে এটি দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করে এবং ২০০৮ সালের এপ্রিলে বিমান সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
ইউএস এয়ারওয়েজ
১৯৩৭ সালে ‘অল আমেরিকান এভিয়েশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর এটি ১৯৫৩ সালে ‘অষষবমযবহু অরৎষরহবং’, ১৯৭৯ সালে ‘টঝঅরৎ’ এবং ১৯৯৭ সালে ‘টঝ অরৎধিুং’ এ পুনরায় পরিচিতি পায়। সে সময় এটি ছিল বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারলাইনসগুলোর একটি। এয়ারলাইনসটি শার্লট, ফিলাডেলফিয়া, ফিনিক্স এবং ওয়াশিংটন ডিসি থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করত। পরে সংস্থাটি প্যাসিফিক সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস (চঝঅ), ট্রাম্প শাটল ও পিডমন্ট এয়ারলাইনস কিনে নেয়। ২০০৯ সালে পাখির আঘাতে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পরে বিমানটি হাডসন নদীতে অবতরণ করে এবং বেঁচে যায়। তবে ২০১৫ সালে এয়ারলাইনসটি বন্ধ হয়ে যায়।
ওয়াও এয়ার
২০১৯ সালে মার্চ মানে আইসল্যান্ড-ভিত্তিক ওয়াও এয়ার, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় অবিশ্বাস্য কম খরচের ফ্লাইট হিসেবে পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ এটি বন্ধ হয়ে যায় এবং দেউলিয়া ঘোষণা করে। সিএনএন-এর রিচার্ড কোয়েস্ট বলেন, ‘ওয়াও’ আর্থিক সমস্যায় ছিল, তারা আইসল্যান্ডএয়ারের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ‘ভবিষ্যৎবাণী স্পষ্ট ছিল কিন্তু ওয়াও কেবল লোকেদের বুকিং নিচ্ছিল।’ আইসল্যান্ডএয়ারের সাথে বহুল প্রত্যাশিত চুক্তি শেষ মুহূর্তে ভেঙে যায়, ফলে পুরো ইউরোপজুড়ে যাত্রীরা আটকে পড়ে। ওয়াও-এর বেগুনি লিভারি ও ক্যারিশম্যাটিক সিইও স্কুলি মোগেনসেন আট বছর আলোচিত ছিল।
থমাস কুক এয়ারলাইনস
ব্রিটিশ ট্যুর অপারেটর থমাস কুক; ১৭৮ বছর ধরে সম্মানিত একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিমান সংস্থাটি হঠাৎ ধসে পড়ে, লাখ লাখ ভ্রমণকারীকে বিপদে ফেলে এবং বিশাল প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা দেখা যায়। কুকের ক্রমবর্ধমান পুরোনো মডেল, নিজস্ব এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের প্যাকেজ ডিল বিক্রি করা এবং হোটেল কক্ষ বুকিংয়ে পিছিয়ে পড়ে। মূলত এয়ারলাইনস কোম্পানিটি অনলাইন প্রতিদ্বন্দ্বী এবং কম বাজেটের নবাগত এয়ার সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সংগ্রাম করছিল। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল পাউন্ডও এই বিমান সংস্থাটির পরাজয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এয়ারলাইনসটি যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক এবং জার্মানি ১০০টিরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করত।