বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে বেনামে মার্জিন ঋণ। কয়েক বছর ধরে মার্জিন ঋণ নিয়ে পথে বসেছে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। নামে বেনামে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কারসাজি চক্র মার্জিন ঋণের ফাঁদে ফেলে তাদের সর্বস্বান্ত করেছে। এবার সেসব কারসাজি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মার্জিন ঋণে অনিয়ম বন্ধ করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার সক্রিয় করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জানা গেছে, গত সপ্তাহে পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্জিন ঋণ সংস্কার ও মিউচুয়াল ফান্ডসংক্রান্ত সুপারিশ ফাস্ট ট্র্যাক গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। মিউচুয়াল ফান্ড দেশের সব ক্ষেত্রে সহজলভ্য করতে ব্যাংক, অনলাইন মার্কেট প্লেস, মোবাইল অপারেটর কোম্পানি থেকে কিনতে পারবেন গ্রাহক।
বিএসইসি-সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারবাজার ধসের অন্যতম কারণ হিসেবে মার্জিন ঋণ পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে নামে বেনামে বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্ট খুলে শেয়ার কারসাজি সিন্ডিকেট একাধিক অ্যাকাউন্টে লেনদেন করে। এসব অ্যাকাউন্টে মার্জিন ঋণ নিয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ার বেচাকেনা করে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি করা হয়। গুজব সৃষ্টি করে ওইসব কোম্পানির শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। ফলে তারা না বুঝে এসব শেয়ারে ঝুঁকে পড়ে। ওইসব শেয়ার কেনার পর ধসে পড়ে দাম। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে এসব অনিয়ম বন্ধ করতে বলা হয়েছে, গৃহিণী, ছাত্র, অবসরে যাওয়া ব্যক্তিসহ যেসব বিনিয়োগকারীর নিয়মিত আয় নেই তারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে মার্জিন ঋণ পাবেন না। এতে বন্ধ হবে বেনামে বিও অ্যাকাউন্ট খুলে মার্জিন ঋণ নিয়ে কারসাজির সুযোগ। ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে শুধু পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ শ্রেণির কোম্পানি ও বিবিবি প্লাস রেটিংয়ের মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ জামানত হিসেবে রাখতে পারবে। এর বাইরের কোনো বিনিয়োগ জামানত হিসেবে রাখতে পারবে না ঋণদাতা কোম্পানি। নগদ টাকা জামানত হিসেবে রাখা যাবে। স্টক এক্সচেঞ্জ ঘোষিত নির্দিষ্ট কোম্পানির বিপরীতে মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে। একক কোনো গ্রাহকের বিপরীতে ঋণদাতা কোম্পানি তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ মার্জিন ঋণ দিতে পারবে। শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড সক্রিয় ও গতিশীল করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএসইসি। বাজারে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ডের দর এখন অভিহিত মূল্যের নিচে। একাধিক ফান্ড ৩ থেকে ৪ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। ফলে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখতে মিউচুয়াল ফান্ড কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিএসইসি এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদ ব্যবস্থাপকদের বিনিয়োগ করা কোম্পানির পরিচালক হওয়ার পথ বন্ধ করছে। বর্তমানে অনেক মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক কোম্পানির পরিচালক হয়ে আছেন এভাবে। একইসঙ্গে ঋণখেলাপিদের মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনায় অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। মিউচুয়াল ফান্ড বিক্রি করতে পারবে ব্যাংক, ডিজিটাল ব্যাংক, এমএফএস, পোস্ট অফিস, স্টক এক্সচেঞ্জ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংকার, স্টক-ব্রোকার, মোবাইল টেলিকম অপারেটর, অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবাপ্রতিষ্ঠান (অনলাইন মার্কেটপ্লেস, থার্ড-পার্টি ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফরম ইত্যাদি। জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণসংক্রান্ত বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যারা কারসাজি করে তারা নানা গুজব ছড়ায়। এ কারণে না বুঝে মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনে। পরে প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার ফোর্স সেল করে; যাতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন সংস্কার হলে বিনিয়োগকারীদের এ ঝুঁকি কমে যাবে। এ ছাড়া বাজারে অল্প বিনিয়োগ নিয়ে মার্জিন ঋণ গ্রহণ বড় রকমের ঝুঁকি তৈরি করে। এটাও বন্ধ হবে। তিনি আরও বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড গতিশীল হলে বাজার স্থিতিশীল হবে। গ্রাহক সহজে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট যেন কিনতে পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফাস্ট ট্র্যাক গুরুত্ব দিয়ে অতিদ্রুত বিএসইসি প্রজ্ঞাপন জরি করে এ সংস্কার করা হবে।