ছয় বছরের ইসরাতের চোখে ভারী লেন্সের চশমা। চোখ পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া হয়েছে এ চশমা। ইসরাতের মা সাদিয়া খানম বলেন, ‘ছোট থেকেই খাওয়ানোর সময় মোবাইলে কার্টুন দিতে হতো। আস্তে আস্তে আসক্তি বেড়ে যায়। মোবাইলে কার্টুন না দিলে প্রচণ্ড জেদ করত। অনেক চেষ্টা করে মোবাইল আসক্তি কমানো গেলেও স্কুলে যাওয়ার পর বুঝতে পারি চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসক পরীক্ষানিরীক্ষা করে পাওয়ারের চশমা দিয়েছেন।’
শুধু শিশু ইসরাত নয়, বিভিন্ন বয়সি মানুষের মাঝেই বেড়েছে চোখের সমস্যা। দীর্ঘ সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে দৃষ্টিস্বল্পতাসহ চোখের নানা রোগে ভুগছে মানুষ। ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ১৪ জনের দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে। এ শিশুদের চোখের ত্রুটি সংশোধনের জন্য চশমা ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢাকা, বরিশাল, জামালপুর ও নওগাঁর বিভিন্ন স্কুলের ৩২ হাজার ৭৪৮ শিশুর চোখ পরীক্ষা করে এ তথ্য পেয়েছেন তারা। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, চার জেলার মধ্যে রাজধানী ঢাকার শিশুদের দৃষ্টিত্রুটির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪০ শতাংশ। গবেষণাটির শিরোনাম ‘বাংলাদেশের কিছু এলাকায় স্কুলের শিশুদের দৃষ্টিত্রুটি পরিস্থিতি’। আরজিসি সুপারস্পেশালটি আই হসপিটালের চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. আতিকুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শিশুরা যত বেশি কাছের জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকবে তত বেশি চোখের ক্ষতি হবে, চশমার প্রয়োজন পড়বে। আগে আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা কম ছিল। কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শিশু-কিশোররা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় কাছের বস্তুতে তাকিয়ে থাকায় তারা মায়োপিয়ায় ভুগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিজের একটা স্টাডিতে দেখেছি গ্রামের শিশুদের তুলনায় শহরের শিশুদের চশমা ব্যবহারের প্রয়োজন বেশি পড়ছে। ট্যারা চোখ, অলস চোখ এ ধরনের সমস্যাও শিশুদের বাড়ছে। সঠিক সময়ে এসব রোগের চিকিৎসা না নিলে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। কাছের বস্তু দেখার জন্য চোখের পেশি দীর্ঘ সময় সংকুচিত থাকলে চোখের সমস্যার পাশাপাশি মাথাব্যথাও হয়। ডিভাইস বেশি ব্যবহারের কারণে শুধু শিশু নয়, সব বয়সি মানুষের চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চোখে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’ মানবিক সাহায্য সংস্থা পরিচালিত জরিপে জানা যায়, গণপরিবহনের ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ চালক দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ চালক উভয় চোখে সমস্যায় ভুগছেন। বাকি ১২ দশমিক ২২ শতাংশ ডান চোখ এবং ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ চালক বাঁ চোখের সমস্যায় ভুগছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫০০ চালকের মধ্যে চোখে সমস্যাজনিত ৩৫২ জন অর্থাৎ ৭০ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে ৬২ জন অর্থাৎ ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করেন। ২৭৭ জন অর্থাৎ ১২ দশমিক ২২ শতাংশ চালক কোনো ধরনের চশমা ব্যবহার করেন না। অতিরিক্ত ১৩ জন বা ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ চালক শুধু সানগ্লাস ব্যবহার করেন।
২৬৫ জন অর্থাৎ ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ চালক বলেন, তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে ও পত্রিকা পড়তে সমস্যা বোধ করেন। আর ১০৯ জন বা ৩০ দশমিক ৯৭ শতাংশ চালক গাড়ি চালানোর সময় রোডের ও দোকানের সাইনবোর্ড দেখে পড়তে সমস্যা হয় বলে জানিয়েছেন।