মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাবারের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন কৃষকরা। শুধু মানসম্মত বীজসংকটে আশানুরূপ ফলন মিলছে না। ফলে প্রতি বছরই পিঁয়াজ, চাল, ডালসহ নানা কৃষিপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আবাদের জমি ও খরচের তুলনায় ফলন কম হওয়ায় কৃষকরাও লাভের মুখ দেখছেন না। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু মানসম্মত বীজে কৃষির ফলন ১৫ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত বীজের তুলনায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজে আলুর ফলন সাড়ে তিন গুণ বেশি পাওয়া গেছে। বীজ ভালো হলে সার ও কীটনাশক কম লাগে। অন্যথায় কৃষির উৎপাদন কমে, খরচ বাড়ে। অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও মানসম্মত বীজের জোগান নিশ্চিত হয়নি দেশে। সরকারি তিন সংস্থা- বিএডিসি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) মিলে বীজের চাহিদার সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ পূরণ করছে। ১৪ শতাংশ পূরণ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বাকিটা কৃষকরাই জোগান দিচ্ছেন বা স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সারা দেশে বীজের চাহিদা ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার ৬২৪ টন। সরকারি তিন সংস্থা মিলে সরবরাহ করেছে ২ লাখ ২ হাজার ৯৭৬ টন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ করেছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩ টন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বীজের চাহিদা পূরণ করেছে মাত্র ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ ভাগের জোগান কৃষকরাই দিয়েছেন। ওই বছর ধানের ৬৪ শতাংশ, গমের ৫৪ শতাংশ, ভুট্টার ৬৫ শতাংশ, পাটের ৭৮ শতাংশ, ডালের ৮ শতাংশ, তেলজাতীয় ফসলের ১৪ শতাংশ, সবজির ৮৫ শতাংশ ও আলু বীজের ১৪ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। আলু বীজের চাহিদা ছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫০ টন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ করে মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার ৭৭১ টন। ৮৬ ভাগ বীজ কৃষকরাই জোগান দেন।
ভালো বীজের পার্থক্য ও বীজের সরবরাহ ঘাটতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিএডিসির মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মো. আবীর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাজার থেকে কেনা আলু বীজে যেখানে ১০-১২ টন আলু উৎপন্ন হয়, আমাদের বীজে সেখানে ৪০ টনের বেশি উৎপাদনও দেখেছি। ধানের উৎপাদনে অবশ্য এতটা পার্থক্য হয় না। তবে বীজ যে কোন ফসলের ফলনে ব্যবধান এনে দেয়। বীজ সরবরাহের ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বীজের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছর আমরা ৩৭ হাজার টন আলু বীজ দিয়েছি। আগামী বছর ৫০ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছি। সমস্যা হচ্ছে, আগামী বছর হয়তো অনেক কৃষক আলুর আবাদ করবে না। কারণ এবার চাহিদার চেয়ে অন্তত ৩০ ভাগ উৎপাদন বেশি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে আলুর দাম ১২-১৪ টাকায় নেমে গেছে। দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক আলুর আবাদ করবে না। উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও সরবরাহ চেইন ঠিক করা জরুরি।’