প্রশাসনে বিভিন্ন স্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আবার বেড়েছে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তারা ওপরের স্তরে যাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। বর্তমানে ৮৫ সচিবের মধ্যে সরকারের শীর্ষ পদ মন্ত্রিপরিষদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবসহ ১৫ জন চুক্তিতে কর্মরত রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা। যাদের অনেকেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বঞ্চিত’ হিসেবে পরিচিত। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকার ঢালাওভাবে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সেই চুক্তি নিয়োগ বাতিল করে এবার নিজেরাই একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ঢালাও নিয়োগের ফলে যোগ্য কর্মকর্তারা তাদের প্রাপ্ত থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটা নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ধরনের বৈষম্য।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একটা কথা বাজারে আছে যে, তদবির যার পদ-পদবি তার। যোগ্য, দক্ষ ব্যক্তিদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া যায়। যারা চাকরিতে নেই তবে অসাধারণভাবে দক্ষ এরকম দুই-একটি ক্ষেত্রে নিয়োগ দিতে পারেন। নিয়মিত চাকরিতে যারা আছেন তাদের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের বাছাই করে পদোন্নতি দিয়ে ওপরের স্তরে যাওয়ার সুযোগে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। সাবেক এই সচিব আরও বলেন, এই মুহূর্তে একজন শক্ত ব্যক্তিত্বের জনপ্রশাসন উপদেষ্টা নিয়োগ প্রয়োজন। যিনি যৌক্তিকভাবে প্রশাসনকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিতে পারেন। তাহলে চুক্তি নিয়োগ বা ঢালাওভাবে যে প্রশ্নগুলো উঠছে সেটি উঠবে না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন পদে আনা হয় রদবদলও। রদবদল করে অনেক স্থানে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরিতে ফেরানো হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন সচিবদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং কাউকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয়। নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে যারা চাকরিতে কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়। বিসিএস ১৫ ব্যাচ থেকে সচিব হওয়ার কথা থাকলেও তাদের থেকে খুব একটা সচিব হচ্ছেন না। এতে ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এর আগের ব্যাচেও যাদের সচিব হওয়ার যোগ্যতা ছিল তাদেরও ডিঙিয়ে চুক্তিতে নিয়োগ দিচ্ছে। এ কারণে তারাও হতাশ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানও চুক্তিতে কর্মরত রয়েছেন। এরা বিসিএস-৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে কয়েক বছর আগেই অবসরে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, জনবিভাগের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এ আকমল হোসেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. মো. নিয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক (সচিব) বেগম শরিফা খান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এ জে এম সালাহউদ্দিন নাগরীও চুক্তিতে কর্মরত রয়েছেন। গত কয়েক মাসে শতাধিকের বেশি কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন পদের বাইরেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদ, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিটিআরসি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিটি করপোরেশনেও চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন কর্মকর্তারা। এদিকে সচিব নেই ৯ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। এগুলো হলো- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, পরিকল্পনা কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব নেই। সচিব না থাকায় নিয়মিত অনেক কাজই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে।