ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন বেলা ১১টা। বনানী ওভারপাসে ওঠার মুখ থেকেই রাজধানীর ফার্মগেটমুখী সড়কটিতে ভয়াবহ যানজট। গুগল ম্যাপে দেখা গেল মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত যানজটে লাল হয়ে আছে সড়কটি। হাজার হাজার গাড়ি যখন সড়কটিতে থেমে থেমে চলছিল, তখন মাথার ওপরের ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (উড়াল সড়ক) ছিল একেবারেই ফাঁকা। মিনিটে পার হচ্ছিল সর্বোচ্চ ১০-১৫টি যানবাহন। যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ যানবাহনই উঠছে না উড়াল সড়কে। ফলে এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে অন্তত ৩০ শতাংশ যানজট কমার যে আশা করা হয়েছিল, সেই সুফল অধরাই রয়ে গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে সড়কটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। নিচ দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত টোলের কারণেই তারা উড়াল সড়ক এড়িয়ে চলছেন। তাদের ধারণা, টোল কমালে বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ গাড়ি উড়াল সড়ক ব্যবহার করত। তাতে যানজটও কমত, এক্সপ্রেসওয়ের আয়ও বাড়ত। উবার চালক মতিউর বলেন, ‘কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মহাখালীর ভাড়া আসে ৩০০ টাকার মতো। সেখানে ৮০ টাকা টোল দিলে থাকে ২২০ টাকা। জ্বালানি খরচ, উবার কোম্পানির অংশ, গাড়ির মালিকের টাকা দিলে কিছুই থাকে না। যাত্রীরা টোলের টাকা দিলে ওপর দিয়ে যাই।’ সড়কটিতে নিজের গাড়ি নিজেই চালিয়ে নিকুঞ্জ থেকে বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি যাচ্ছিলেন তারেক মামুন। তিনি বলেন, ‘এটুকু পথ যাওয়ার জন্য অহেতুক ৮০ টাকা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। ২০-৩০ টাকা হলে ঠিক ছিল। তখন উড়াল সড়ক দিয়েই যেতাম।’ একই কারণে উড়াল সড়কে উঠছে না পিকআপ, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনও। এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার অনুমতি না থাকায় এগুলোও চলছে নিচের সড়ক দিয়ে। দূরপাল্লার হাতে গোনা কিছু বাস ওপর দিয়ে যেতে দেখা গেলেও উঠছে না লোকাল বাস। তারা বলছেন, ‘ওপর দিয়ে গেলে যাত্রী পাওয়া যায় না।’ ফলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উড়াল সড়কটি যানজট নিরসনে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারছে না।
তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সবার জন্য খুলে দেওয়া হয় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। সড়কটি ব্যবহারের জন্য বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যে কোনো স্থানে ওঠানামার ক্ষেত্রে কার, ট্যাক্সি, জিপ, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল, মাইক্রোবাস (১৬ সিটের কম) এবং হালকা ট্রাকের জন্য (৩ টনের কম) ৮০ টাকা, সব ধরনের বাসের জন্য (১৬ সিট বা এর বেশি) ১৬০ টাকা, মাঝারি ট্রাক (৬ চাকা পর্যন্ত) ৩২০ টাকা ও বড় ট্রাকের জন্য (৬ চাকার বেশি) ৪০০ টাকা টোল দিতে হয়। উন্মুক্ত হওয়ার প্রথম দিন ২২ হাজার ৮০৫টি বাহন থেকে ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৮০ টাকা টোল আদায় হয়। ওই মাসে দিনে গড়ে টোল আদায় হয় ২৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা। চলতি জানুয়ারির প্রথম ২০ দিনে গড়ে দৈনিক টোল আদায় হয়েছে ৫৩ লাখের মতো। আয় দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও উড়াল সড়কটির ধারণক্ষমতা ও সক্ষমতার খুব কমই ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চলতি জানুয়ারির ১-২০ তারিখ পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলাচল করেছে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৩৬টি যানবাহন। টোল আদায় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে সব র্যাম্প দিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠছে মাত্র ৪৫টি গাড়ি। অথচ তখন নিচের সড়কের প্রতি কিলোমিটারে যানজটে আটকা থাকছে কয়েক হাজার গাড়ি। উড়াল সড়কের ব্যবহার বাড়াতে সিএনজি অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলের অনুমতি প্রদান এবং টোল কমানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম এস আকতার বলেন, আপাতত এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।