দখল-দূষণ, বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম ও বাঁক কাটার কারণে ক্রমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে হালদা নদী। দেশে একমাত্র এ নদীতেই প্রাকৃতিকভাবে রুই, কাতলা ও কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন হয়। বছরে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলা কেন্দ্র করে প্রবাহিত ১২৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ নদী। এর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার ১ নম্বর পাতাছড়া ইউনিয়নের হালদাছড়া। সেখান থেকে কালুরঘাটের কাছে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিলিত হয়। চলতি পথে হালদায় ৩৬টি ছড়া ও খাল এসে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে খালের সংখ্যা ১৯। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ‘চবি হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। এখানে শিক্ষার্থীরা মৎস্যসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেন। হালদা নদী নিয়ে তৈরি হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘হালদা’। এ নদীতেই আছে দেড় শতাধিক গাঙ্গেয় ডলফিন। জানা যায়, হালদা নদীর অর্থনৈতিক মূল্যায়নের কোনো জরিপ কিংবা পরিসংখ্যান নেই। তবু এ নদীর আর্থিক মূল্যায়ন করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কেবল ডিম সংগ্রহ, রেণু উৎপাদন, পোনা ও মাছ বিক্রি করে বছরে আয় হয় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। আর এ নদীর বালু উত্তোলন, চট্টগ্রাম ওয়াসার সুপেয় পানি সংগ্রহ, নদীর উভয় পারের মানুষের কৃষিকার্য, জীবনজীবিকা প্রভৃতি মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা আয় হয় এ নদী ঘিরে। এর সঙ্গে আছে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পরিবেশগত মূল্যায়ন। এসব যোগ হলে অর্থের সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে নদীটির উন্নয়নে ‘হালদা নদী প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প দ্বিতীয় পর্যায়’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলমান। হালদা নদীর প্রবীণ ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর বলেন, ‘এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পূর্ণিমা-অমাবস্যার তিথিতে বজ্রসহ বৃষ্টি হলে নদীতে পাহাড়ি ঢল নামে। এসব মা মাছ সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কর্ণফুলীসহ সংযুক্ত বিভিন্ন শাখা নদী ও খাল থেকে হালদায় চলে আসে। এরপর উপযুক্ত পরিবেশ বুঝে নদীতে প্রথমে নমুনা ও পরে মূল ডিম ছাড়ে। এ সময় আমরা ডিম সংগ্রহে নৌকাসহ নানা উপকরণ নিয়ে নদীতে নেমে যাই। হালদার পোনাগুলো অনেক মানসম্পন্ন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই পোনা সংগ্রহে আসেন।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘হালদা উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। নদীটির আর্থসামাজিক গুরুত্ব ও অবদান অনেক। কেবল মৎস্য খাতেই জাতীয় অর্থনীতিতে এটি বছরে ৮০০ কোটি টাকার অবদান রাখে। সঙ্গে আছে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য।’ তিনি বলেন, ‘গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্যে দূষণ, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, রাবার ড্যাম ও স্লুইসগেট স্থাপন, উজান থেকে কীটনাশকের পানি প্রবেশসহ নানা কারণে হালদা দূষিত হয়। এসব থেকে নদীটি বাঁচানো গেলে এর আর্থিক মূল্যায়ন আরও বাড়বে।’ হালদা নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রাকৃতিক নদীকে প্রাকৃতিকভাবে থাকতে দেওয়া উচিত। প্রকৃতিকে বিরক্ত করলে তারা আমাদের কাছ থেকে সময়মতো প্রতিশোধ নেবেই।’ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাসচন্দ্র চন্দ বলেন, ‘হালদার উন্নয়নে চলমান প্রকল্পের অধীন হ্যাচারি নির্মাণসহ কিছু কাজ চলছে। সঙ্গে দখল-দূষণ ঠেকাতে নিয়মিত অভিযানও চলমান।’