ফিলিস্তিনের গাজায় দীর্ঘ ১৫ মাস পর যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ায় ফিরে আসতে শুরু করেছেন বাসিন্দারা। কিন্তু তারা এসে দেখছেন, চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। ঘরবাড়ি কিছুই নেই। বড় বড় ভবনগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তার পরেও বাসিন্দারা নিজের ভূমিতে পা রেখে এক ধরনের স্বস্তির ছোঁয়া পাচ্ছেন। এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর প্রথম দিনে তিন ইসরায়েলি নারী বন্দি মুক্তি পেয়েছেন, সঙ্গে মুক্তি পেয়েছেন ৯০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি। সূত্র : সিএনএন, রয়টার্স, আলজাজিরা
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে আরও চার ইসরায়েলি ও অজ্ঞাতসংখ্যক ফিলিস্তিনি মুক্তি পাবেন। প্রথম দিনে ইসরায়েলি নাগরিক রোমি গোনেন, এমিলি ডামারি ও ডোরন স্টাইনব্রেগার মুক্তি পেয়েছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ওই তিন নারীকে তেল আবিবের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন। সূত্র জানান, হামাস তিনজন ইসরায়েলি নারী বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার পর ইসরায়েল ৯০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়। মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিরা সবাই নারী ও শিশু। আরেক খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের কারাগার থেকে অন্যদের পাশাপাশি মুক্তি পেয়েছেন রাজনীতিবিদ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)-এর নেতা খালিদা জাররার। তিনি একসময় ফিলিস্তিন পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। ইসরায়েলে তাঁকে নির্জন কারাকক্ষে রাখা হয়েছিল। মুক্তির পর খালিদার শীর্ণ চেহারা দেখে অবাক হয়েছেন অনেকেই। এ ছাড়া মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শিশুদের কয়েকজনকে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর পাথর ছোড়ার অভিযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বন্দিদের তালিকায় এমন শত শত মানুষের নাম আছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগও আনা হয়নি। ফিলিস্তিনি কারাবন্দিদের সংগঠন প্যালেস্টাইন প্রিজনার্স সোসাইটি এবং কারাবন্দি ও সাবেক কারাবন্দিদের জন্য গঠন করা কমিশন জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ১০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো ইসরায়েলের কারাগারগুলোয় বন্দি আছে।
রাফা থেকে ৪৩ বছর বয়সি আল নাসের বলেছেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ায় তিনি আনন্দিত। কারণ, এর ফলে রক্তপাত থামবে। বাচ্চাদের জীবন বাঁচবে। তিনি জানিয়েছেন, ‘রাফায় ফিরে আমি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। যে জায়গায় আমি থাকতাম, সে জায়গাটা দেখে মনে হয়েছে, যেন ভয়ংকর ভূমিকম্প সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য।’
চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ : ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর তা বে গাজাবাসীদের ঘরবাড়ি একেবারে মাটিতে মিশে গেছে। যেখানে চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। গাজা শহর থেকে পালিয়ে জাবালিয়ায় আশ্রয় নেন ৪৩ বছর বয়সি রানা মোহসেন। হাজারো ফিলিস্তিনির মতো তিনিও যুদ্ধবিরতির দিনটির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর তিনি রাফায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অবশেষে আমরা আমাদের বাড়িতে পৌঁছেছি।
আমাদের বাড়ির কিছুই অবশিষ্ট নেই, চারদিক শুধুই ধ্বংসস্তূপ, তার পরও বলব এটা আমাদেরই বাড়ি।’ ইসরায়েলি বাহিনী পুরো বাড়িটি ধ্বংস করে দিয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাড়ির ছাদই কেবল অবশিষ্ট আছে। ধ্বংসের পরিমাণ অকল্পনীয়। ভবনের চিহ্নগুলো সম্পূণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে, যেন এটি একটি ভূতের শহর বা পরিত্যক্ত শহর।’ গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ শহরের নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন আহমদ আল-বালাউই। রানা মোহসেনের মতো একই দৃশ্য বর্ণনা করেন তিনি। আল-বালাউই বলেন, ‘শহরে ফিরে আসার পর আমি হতবাক হয়ে গেছি। পচা মৃতদেহ, সর্বত্র শুধু ধ্বংসস্তূপ। পুরো এলাকা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও আগামী কয়েকটা সপ্তাহ কঠিন হতে চলেছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপের ছয় সপ্তাহে ৩৩ জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস। এর বিনিময়ে নির্দিষ্টসংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পাবে ইসরায়েলের কারাগার থেকে। গাজায় ত্রাণ সরবরাহ বাড়ানো হবে এবং ইসরায়েলি সেনাদের একাংশ গাজা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি শুরু হবে। তবে যুদ্ধবিরতির প্রথম ছয় থেকে সাত সপ্তাহ সময়টা কঠিন হবে বলে মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ। তিনি বলেন, এ যুদ্ধ থামানোর কোনো ইচ্ছা নেই ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের। তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি এজেন্ডা রয়েছে। সেই এজেন্ডা হলো তারা গাজা দখল করতে চায়, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দিতে চায়।