একের পর এক আইন লঙ্ঘন, বলপ্রয়োগে ভঙ্গ হয়েছিল অতীতের সব রেকর্ড। বন্ধুর বদলে পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়ে উঠেছিল পতিত সরকারের মূল হাতিয়ার। বিরোধী মতের নিরীহ মানুষের কাছে সাক্ষাৎ যমদূতের নাম হয়ে উঠেছিল পুলিশ। সর্বশেষ জুলাই-আগস্টে প্রতিবাদমুখর নিরীহ ছাত্র-জনতার সঙ্গে এই বাহিনীর সদস্যদের আচরণ-তাদের অতীতের সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। এখনো নেটদুনিয়ায় ভাসছে সেসব নৃশংস ঘটনাবলি। এসব দৃশ্য দেখে এখনো আঁতকে ওঠেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে সেই পুলিশই নতুন বাংলাদেশে ইমেজ পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জন আস্থা ফেরাতে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। পুলিশ যেতে চাইছে জনগণের দোরগোড়ায়। জানা গেছে, সরকার পতনের পর ছাত্র-জনতার তোপের মুখে ডিএমপিসহ পুলিশের অধিকাংশ সুবিধাবাদী সদস্য আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে তাদের অনেককে গ্রেপ্তার, বরখাস্ত এবং বদলি করা হয়। টালমাটাল হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পুলিশিং শুরু হলেও কর্মকান্ডে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি পুলিশ। ফলে চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ়- ভয় করে জয় করার সংগ্রামে রত।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মমতা, গুম এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে বিগত ১৫ বছর। ফলে আইনি কাঠামো থেকে বেরিয়ে সরকারের লাঠিয়ালে রূপান্তরিত হয়েছিল পুলিশ। সঙ্গে ব্যস্ত ছিল নিজেদের আখের গোছানোর কাজে। ওই কালিমা দূর করতে এবং বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে প্রয়োজন আইনি সংস্কার। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে এই বাহিনীকে বাইরে রাখতে গঠন করতে হবে স্বাধীন পুলিশ কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটমেন্ট নিয়ে চলমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপি ও জামায়াতসহ অধিকাংশ প্রথম সারির রাজনৈতিক দল পুলিশি নিষেধাজ্ঞায় ঢাকায় পায়নি সভা-সমাবেশের অনুমতি। উল্টো গত ১৫ বছরে একাধিকবার রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে তল্লাশির নামে ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়ে হয়েছে লুটপাট। মিছিল-সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দুর্বৃত্তের ভূমিকা পালন করে আসছিল তারা। তবে পতিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠা সেই পুলিশ বাহিনী তোপের মুখে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়। যদিও আন্দোলন দমাতে শুরু থেকেই মারমুখী ছিল পুলিশ। কিন্তু ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখে তাদের পিছু হটতে হয়েছে বারবার। সর্বশেষ ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ত্যাগে ভেঙে পড়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড। থানা, ট্রাফিক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশ সদস্যদের মারধর ও হত্যার ঘটনা ঘটে।
বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন এবং এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করা সফররাজ হোসেনকে। তবে গণ বদলি ও মিথ্যা মামলায় সহায়তা করায় ফের পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় বিব্রত হচ্ছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা।
নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্য : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। গত ২৫ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশিত এ তালিকায় নিহত পুলিশ সদস্যের নাম, পদের নাম, মৃত্যুর তারিখ, কোন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন ও ঘটনাস্থল উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুলিশ পরিদর্শক, ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), সাতজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), একজন এটিএসআই, একজন নায়েক ও ২১ জন কনস্টেবল। অন্যদিকে ওই সময় মারা যান ২ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা।
যা বলছেন আইজিপি : পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম বলেন, গত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এতগুলো মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন- এশিয়ার ইতিহাসেও এমন নেই। পুলিশের বিষয়ে তৈরি হওয়া সাধারণ মানুষের ধারণা পরিবর্তন করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের পুনর্গঠনের কাজটা কিন্তু চলমান। মিথ্যা মামলায় পুলিশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর তদন্ত করছে। গণমাধ্যমে অনেকের নাম পেয়েছি। আমরা নিজেরাও তদন্ত করছি। আইন-বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে ২১১ ধারা অনুযায়ী, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে সেই বাদীকে। তিনি আরও জানান, পুলিশের কার্যক্রম মনিটরিং ও তদন্তে মান বাড়াতে ঊর্ধ্বতন এবং অভিজ্ঞ- যারা বিপুল অভিজ্ঞতা নিয়ে অবসরে গেছেন, তাদের নিয়ে আটটা জায়গায় আলাদা মনিটরিং টিম করেছি।
আস্থা ফেরাতে মরিয়া পুলিশ : জনআস্থা ফেরাতে বিট পুলিশিং চাঙা ও জনগণের দোরগোড়ায় দৌড়াচ্ছে পুলিশ। জনগণের অভিযোগ, সমস্যা শুনতে চেষ্টা করছে পুলিশ। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় মতবিনিময় সভার আয়োজন করছে ডিএমপি। এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে ডিবি ও থানা পুলিশকে সক্রিয় করা হয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। আমরা ঢাকাবাসীর মতামত নিয়ে সর্বোত্তম পুলিশি সেবা দিতে চাই। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকাবাসীর সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কাজ করা দুরূহ হয়।
গণ অভ্যুত্থানে দমনপীড়নসহ গণহত্যায় জড়িতদের তালিকা হচ্ছে : গণ অভ্যুত্থান দমনে হত্যা, গণহত্যা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের তালিকা তৈরি করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। বিভিন্ন বাহিনীকে একাধিক চিঠি পাঠিয়েছে তদন্ত সংস্থা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ঘটনায় অন্তত ৪৪৯ জন পুলিশ সদস্যকে ৩০০টি মামলায় আসামি করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই হত্যা মামলা। এসব মামলায় পুলিশের দুই সাবেক মহাপরিদর্শকসহ ১৭ কর্মকর্তা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ও জড়িত পুলিশ সদস্যদের আরও অনেককে পর্যায়ক্রমে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।